গত দেড় বছরের ব্যবধানে চরশাখাহাতীর পশ্চিম দিকে প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা নদীভাঙনের কবলে পড়েছে। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে চরশাখাহাতী প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ইতিমধ্যে দুবার স্থানান্তরিত করতে হয়েছে এবং এলাকার একমাত্র কমিউনিটি ক্লিনিকটিও ভেঙে গেছে।

ভেঙে যাওয়া চরশাখাহাতী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংলগ্ন এলাকায় নতুন করে বসতি স্থাপন করেছে কয়েক শ পরিবার। তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় দেখা যায়, দুপুরের প্রখর রোদে একটি এক বছর বয়সী শিমুলগাছের নিচে বসে আছেন শাপলা মণি (২৮) ও শিরিনা বেগম (৫৫)। সামনের মাঠে কৃষকেরা পাট কাটার পর সেখানে ভুট্টা চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। লাভজনক গাঞ্জিয়া ধানের পরিবর্তে তারা এখন ২৮ ধান লাগাচ্ছেন। দিগন্তের দূরে আসামের গারো পাহাড়ের সারি স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

চরের মানুষের মাঝে সবচেয়ে বেশি কোন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়, তা জানতে চাওয়া হলে শিরিনা বেগম বলেন, “চরে রোগবালাই কমই আল্লায় দেয়। খালি গর্ভবতীদের বাচ্চা হওয়ার সময় সমস্যা হয়।”

শিরিনা বেগমের কথার রেশ ধরে শাপলা মণি জানান, “ক্লিনিকে একজনই লোক, তা-ও পুরুষ মানুষ। চেকআপ কার্ডে দিন-তারিখ লিখে রাখে। চেকআপের জন্যও থানাহাটে (উপজেলা সদর) যাওয়া লাগে। আর ফ্রেন্ডশিপ এনজিওর এক আপা মাসে একবার আসেন। তিনি সর্দি-কাশির ওষুধ দেন, খিচুড়ি খাওয়ান আর ৫ টাকা নেন। তাঁর নাম ৫ টাকার ডাক্তার।”

সাধারণত চরাঞ্চলে মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে তীব্র ডায়রিয়া ও ডিহাইড্রেশন, শিশুদের নিউমোনিয়া, প্রসূতি মায়েদের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, প্রসবজনিত জটিলতা, নবজাতকের শ্বাসকষ্ট বা ধনুষ্টঙ্কার, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক এবং সাপের কামড় অন্যতম।

ফেরার পথে শাখাহাতী ঘাটে দেখা হয় কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার ইয়াসিনের সঙ্গে। তিনি জানান, পুরো উপজেলায় ১৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে এবং এ পদে ১০ থেকে ১১ জন নারী কর্মরত আছেন। ব্রহ্মপুত্রের চরে অবস্থিত চিলমারী, অষ্টমীরচর ও নয়ারহাট—এই তিনটি ইউনিয়নের মোট আটটি ক্লিনিকের একটিতেও প্রসবের কোনো ব্যবস্থা নেই।

ইয়াসিন আরও জানান, তাঁদের কাজ মূলত গর্ভবতী নারীদের ওজন, উচ্চতা, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হিমোগ্লোবিন পরিমাপ করা। এছাড়া তাঁরা ২২ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করেন।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য রফিকুল ইসলাম (৬৭) দাবি জানান, গর্ভবতী নারীরা যেন চরেই নিরাপদে সন্তান জন্ম দিতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা এখন তাঁদের প্রধান দাবি।

চরের বাস্তবতায় একজন নারীকে বাড়ি থেকে নদীর ঘাট পর্যন্ত পৌঁছে দিতেই প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। এরপর নৌকায় ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার উজান বেয়ে উপজেলা সদরে পৌঁছাতে আরও দুই ঘণ্টার বেশি সময় প্রয়োজন হয়। এই দীর্ঘসূত্রিতার কারণেই অনেক ক্ষেত্রে প্রসূতি মা ও নবজাতকের মৃত্যু ঘটে।

ক্লিনিকগুলোতে যে ২২ ধরনের ট্যাবলেট দেওয়া হয়, সেগুলো মূলত কৃমিনাশক; উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও বুকের ব্যথা (এনজাইনা) নিয়ন্ত্রণ; গ্যাস্ট্রিক, আলসার, বুকজ্বালা ও পেটে অতিরিক্ত অম্লতা প্রতিরোধ; সর্দি, হাঁচি, অ্যালার্জি ও চুলকানির চিকিৎসা; শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ ও হাড় শক্ত রাখা; রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া দূর করা ও হিমোগ্লোবিন বাড়ানো; পেটে বা অন্ত্রে মোচড় দিয়ে ব্যথা ও ক্র্যাম্প কমানো; জ্বর ও হালকা থেকে মাঝারি ধরনের ব্যথা, যেমন মাথাব্যথা ও শরীরব্যথা কমানো; শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি (অ্যাজমা) ও ব্রঙ্কাইটিসের চিকিৎসা; ভিটামিন বি-এর ঘাটতি পূরণ, দুর্বলতা দূর করা ও স্নায়ুর স্বাস্থ্য ভালো রাখা এবং ডায়রিয়ার চিকিৎসা ও শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।

এর পাশাপাশি ত্বক ও মুখের ক্ষত বা ছত্রাকজনিত সংক্রমণের চিকিৎসায় বাহ্যিক অ্যান্টিসেপটিক, চুলকানি ও খোসপাঁচড়া চিকিৎসায় ব্যবহৃত লোশন; ত্বকের কাটাছেঁড়া, ছোটখাটো ক্ষত বা পোড়ার সংক্রমণ, দাদ ও একজিমা প্রতিরোধে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক মলম; চোখের ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ বা ইনফেকশন (যেমন চোখ ওঠা) চিকিৎসায় ব্যবহৃত ড্রপ এবং ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানার কারণে শরীরে পানির ঘাটতি ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা দূর করতে ব্যবহৃত স্যালাইন দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, চরাঞ্চলে মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র ডায়রিয়া ও ডিহাইড্রেশন, শিশুর নিউমোনিয়া, প্রসূতি মায়ের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, প্রসবজনিত জটিলতা, নবজাতকের শ্বাসকষ্ট বা ধনুষ্টঙ্কার, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক ও সাপের কামড়।

অর্থাৎ, ডায়রিয়া ছাড়া এই মারাত্মক রোগগুলোর প্রায় কোনোটিরই চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা এই ক্লিনিকগুলোতে নেই। এমতাবস্থায় প্রশ্ন জাগে, এই কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর প্রকৃত কাজ কী?

—নাহিদ হাসান
লেখক ও সংগঠক
[email protected]