ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে আর্থিক বিধিমালা লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে। ১০০টিরও বেশি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে এই ক্লাবটি। তবে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে সিটি। এখন প্রশ্ন উঠেছে, এই আইনি লড়াইয়ে কি নিজেদের অবস্থান রক্ষা করতে পারবে তারা? শীর্ষস্থানীয় একজন আইনজীবীর মতে, আপিলে জয়ের পথ প্রশস্ত করতে সিটিকে বেশ কঠিন কিছু ‘বাধা’র সম্মুখীন হতে হবে।
২০০৯-১০ থেকে ২০১৭-১৮ মৌসুমের মধ্যবর্তী সময়ে প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নিয়ম ভঙ্গ এবং স্পনসরশিপ চুক্তির অংক ৮৩ কোটি পাউন্ড বাড়িয়ে দেখিয়ে ‘বানোয়াট চুক্তি’ করার সব অভিযোগই সিটির বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে। তবে ক্লাব কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা ‘প্রিমিয়ার লিগে আনা অভিযোগে নির্দোষ’ এবং বর্তমান রায়ে ‘আইন, নীতি, তথ্যে স্পষ্ট ভুল রয়েছে। এটি যে টেকসই নয়’, সে বিষয়ে তাদের কাছে ‘অকাট্য প্রমাণ’ রয়েছে।
বিবিসি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, আপিলের শুনানিতে সিটি যুক্তি দেখাবে যে, স্পনসরদের শেয়ারহোল্ডার হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার ওই অর্থ প্রদান করেছিল এবং বর্তমান কমিশনের রায়ে অসংগতি রয়েছে। সিটির দাবি, স্পনসরশিপের অর্থ সম্পূর্ণ বৈধ ছিল এবং মালিকপক্ষের মাধ্যমে তা কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হয়নি।
লন্ডন সলিসিটর লিটিগেশন অ্যাসোসিয়েশনের (এলএসএলএ) সদস্য এবং পেনিংটনস ম্যানচেস কুপারের পার্টনার জেমস সেভার্ন বিবিসি স্পোর্টসকে জানিয়েছেন, এই আপিল প্রক্রিয়াটি কেবল রায় বাতিল করার জন্য ‘নতুন কোনো প্যানেল ডাকার সুযোগ নয়’।
সেভার্ন বলেন, ‘কমিশনের সিদ্ধান্তে তাৎপর্যপূর্ণভাবে প্রভাব ফেলেছে—আইন, নীতি বা তথ্যের এমন কোনো বস্তুগত ভুল কিংবা গুরুতর পদ্ধতিগত অনিয়ম সিটিকে চিহ্নিত করতে হবে। তা সত্ত্বেও আপিল মঞ্জুর বা খারিজ করা, সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা বা অন্য যেকোনো আদেশ দেওয়ার সুদূরপ্রসারী ক্ষমতা রয়েছে আপিল বোর্ডের।’
পুরো মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সিটির অন্যতম প্রধান স্পনসর ইতিহাদ এয়ারওয়েজ। প্রতিষ্ঠানটি এর আগে জানিয়েছিল যে, ম্যানচেস্টার সিটির স্পনসরশিপের জন্য আবুধাবি সরকার কোনো অর্থ প্রদান করেনি। ২০১৫ সালে নিউইয়র্কে মার্কিন তদন্তের অংশ হিসেবে আদালতের নথিতে এই তথ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়।
সিটি এখন যুক্তি দেবে যে, ওই তথ্যের মাধ্যমে পুরো পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয় এবং তারা যে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ করেছে তা প্রমাণিত হয় না। ক্লাবটির দাবি, সরকারি নথিপত্র তাদের অবস্থানকে পুরোপুরি সমর্থন করে। তবে সেভার্ন মনে করেন, এই নথিপত্রগুলো যদি আগে থেকেই কমিশনের কাছে থেকে থাকে, তবে আপিলে তা খুব একটা কার্যকর নাও হতে পারে।
সেভার্নের ভাষায়, ‘ব্যাংক বিবরণী, সরকারি রেকর্ড এবং সমসাময়িক অর্থ প্রদানের নথিপত্রগুলো জোরালো প্রমাণ হতে পারে, যদি সেগুলো থেকে পরিষ্কার অডিট ট্রেইল বা হিসাবের পথ নিশ্চিত করা যায় যে বিতর্কিত তহবিলগুলো মালিকদের পরিবর্তে আবুধাবি সরকার থেকেই এসেছে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘তবে, যদি সেই প্রমাণ ইতিমধ্যে কমিশনের সামনে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে এবং তা সত্ত্বেও কমিশন যদি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে থাকে যে প্রক্রিয়াগুলো বানোয়াট ছিল, তবে রায়টি বস্তুগতভাবে ভুল প্রমাণে সিটিকে কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হবে।’
সিটি আপিল করার আগেই ইতিহাদ এয়ারওয়েজ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রিমিয়ার লিগের পক্ষ থেকে তাদের ‘প্রতিনিধিত্ব করার, প্রাসঙ্গিক তথ্য সরবরাহ করার কিংবা যে তথ্যের ওপর নির্ভর করা হয়েছে তার নির্ভুলতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার কোনো সুযোগ কখনো দেওয়া হয়নি।’
জেমস সেভার্ন বলেন, ইতিহাদ এয়ারওয়েজের এই অভিযোগ ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো পদ্ধতিগত অনিয়ম প্রমাণ করে না। ইতিহাদ এই মামলার বিবাদী ছিল না এবং কার্যক্রমে অংশগ্রহণের স্বাধীন কোনো অধিকার তাদের থাকার কথা নয়। উভয় পক্ষের জন্য এমন প্রমাণ সংগ্রহ করে কমিশনের সামনে উপস্থাপন করার সুযোগ থাকা উচিত ছিল। আপিল বোর্ড যদি ইতিহাদের পক্ষ থেকে নতুন প্রমাণ বিবেচনা করতে রাজি হয়, তবে সমসাময়িক নথিপত্র দ্বারা সমর্থিত হলে সেগুলোর গুরুত্ব বেশি হতে পারে।’
সিটির আইনি লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হবে স্বাধীন কমিশনের ‘ফুটবল লিকস’ ফাইলের মেইলগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করা।
সেভার্ন বলেন, ‘সিটি যদি প্রমাণ করতে পারে যে কমিশন মেইলগুলো মৌলিকভাবে ভুল বুঝেছে, সেগুলোর সঠিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে অথবা অন্যান্য সমসাময়িক নথিপত্রের সঙ্গে অসংগত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, তবে তথ্যগত ভুলের শামিল হতে পারে। সিটির মূল সমস্যা হলো, কমিশন প্রত্যক্ষদর্শী ও দালিলিক প্রমাণগুলো গভীরভাবে শুনেও বানোয়াট ব্যবস্থা ও মালিকদের গোপন অর্থায়নের মতো গুরুতর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল ফিন্যান্সের অধ্যাপক কাইরেন ম্যাগুয়ার বিবিসি স্পোর্টসকে জানিয়েছেন, কমিশন লক্ষ্য করেছে যে ‘অপরাধের সঙ্গে মানানসই করতে নথিপত্রগুলো পরবর্তী সময়ে তৈরি বা সাজানো হয়েছিল’।
ম্যাগুয়ার বলেন, ‘কমিশন নিশ্চয়ই এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, ম্যানচেস্টার সিটি যেসব সাক্ষ্যপ্রমাণ ও সাক্ষী হাজির করেছিল, সেগুলোর মান এবং বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল দুর্বল। যদি সিটির আইনি দল প্রমাণ করতে পারে যে কমিশন নিজেই ত্রুটিপূর্ণ কাঠামো; কারণ এর সদস্যরা ম্যানচেস্টার সিটির পরিবর্তে প্রিমিয়ার লিগের মনোনীত ব্যক্তি ছিলেন, ফলে শুরু থেকেই ক্লাবটির বিরুদ্ধে প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল। তবে তেমনটি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।’
তবে ম্যাগুয়ারের বিশ্বাস, সিটির জন্য সফল হওয়া কঠিন হলেও ‘একটি পথ খোলা আছে’।
আপিলের বিষয়ে আইনি পরামর্শ পেতে সিটি মার্ক হাওয়ার্ড কেসি-কে যুক্ত করেছে। অন্যদিকে ইতিহাদ এয়ারওয়েজ নিয়োগ করেছে আইনি ফার্ম কুইন ইমানুয়েলের। ম্যাগুয়ার বলেন, ‘ম্যানচেস্টার সিটি যেসব আইনজীবী নিয়োগ করেছে, তাতে তারা এমন একটি কৌশল নিতে পারে যেটা আমার কাছে বিশৃঙ্খলা ও হইচই তৈরি করার পদ্ধতি মনে হয়। এর অর্থ, উপস্থাপন করা প্রমাণের চেয়ে কমিশনের প্রক্রিয়া সম্পর্কিত সবকিছুকে হেয় করার চেষ্টা করা।’
প্রিমিয়ার লিগের নিয়ম অনুযায়ী, আপিলের শুনানি ১২ সপ্তাহের মধ্যে অথবা বড়দিনের আগের সন্ধ্যার মধ্যে শেষ করতে হয়। তবে সেভার্ন মনে করেন, ‘কার্যক্রমের পরিধি ও জটিলতা বিবেচনায় চূড়ান্ত ফলাফল জানতে কিছুদিন সময় লাগবে।’