ফুটবল খেলার মাঠের চিরচেনা হলুদ ও লাল কার্ডের দিন কি তবে শেষ হতে চলেছে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওর পর ফুটবলপ্রেমীদের মনে এই প্রশ্নটি দানা বেঁধেছে। সম্প্রতি এক ম্যাচে দেখা গেছে, একজন রেফারি খেলোয়াড়কে সতর্ক করতে হাতের মুঠোয় ফোন আকৃতির একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র উঁচিয়ে ধরেছেন। মূলত কার্ড দেখানোর প্রচলিত প্রথাটিকে আধুনিক করার লক্ষ্যেই এই পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিচিত হলুদ কার্ডের বদলে ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহার করেছেন ম্যাচ রেফারি এদুয়ার্দো ভারেলা। গত বৃহস্পতিবার উরুগুয়ে কাপের ন্যাসিওনাল ও রেনতিস্তাসের মধ্যকার ম্যাচে এই অভিনব দৃশ্যটি পরিলক্ষিত হয়।
রেফারির প্রশাসনিক কাজগুলোকে আরও সহজ করতে এবং শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তগুলো ডিজিটাল পদ্ধতিতে রেকর্ড করার উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ। এই প্রকল্পের নেপথ্যে থাকা প্রতিষ্ঠান ‘রেফে’র পরিচালক মাউরো সাকো শুক্রবার উরুগুয়ের রেডিও ‘এল এস্পেকতাদোর দেপোর্তেস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ফুটবলে একমাত্র যে বিষয়টি এখনো অ্যানালগ রয়েছে, আমরা সেখানে প্রযুক্তি নিয়ে আসতে কাজ করছি।’
ডিজিটাল স্ক্রিনে কার্ড দেখানোর এই ধারণার জন্ম হয়েছিল তিন বছরেরও বেশি সময় আগে। সাকো এবং তাঁর সহপরিচালক ডিয়েগো দে লা পেনা বৃষ্টির মধ্যে একটি ম্যাচ দেখার সময় লক্ষ্য করেন যে, রেফারিরা কীভাবে হাতে লিখে সতর্কবার্তার রেকর্ড রাখেন এবং পরবর্তীতে সেই তথ্য ডিজিটাল সিস্টেমে স্থানান্তর করেন। সাধারণত কার্ড দেখানোর পর রেফারিরা তা কলম দিয়ে নোটে লিখে রাখেন এবং পরে তা ডিজিটাল সিস্টেমে সংরক্ষণ করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে আধুনিক করার লক্ষ্যেই ডিজিটাল কার্ডের চিন্তাটি সামনে আসে।
নতুন এই ডিভাইসটি নির্দিষ্ট সময়ের উল্লেখসহ (টাইমস্ট্যাম্প) ম্যাচের বিভিন্ন ঘটনা রেকর্ড করতে সক্ষম। নির্মাতাদের মূল লক্ষ্য হলো উরুগুয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ‘কমেট’ প্ল্যাটফর্মে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াটিকে আরও গতিশীল ও সহজ করা।
রেফারি ভারেলা জানান, তাঁর কাছে এই নতুন যন্ত্রটি ব্যবহার করা বেশ আরামদায়ক মনে হয়েছে এবং এর সফটওয়্যারটিও দ্রুত কাজ করে। তবে তিনি একটি বিশেষ অভাব অনুভব করেছেন। তাঁর মতে, পুরনো পদ্ধতিতে কার্ড দেখানোর যে নাটকীয়তা ছিল, ডিজিটাল স্ক্রিনে তা অনুপস্থিত। ভারেলার ভাষায়, ‘দ্রুত কার্ড দেখানোর সেই জাদুকরি ব্যাপারটি কিছুটা হারিয়ে যায়, তবে আমার মনে হয় এটি আমাদের অনেক সাহায্য করবে, বিশেষ করে প্রশাসনিক কাজে।’
তবে প্রথমবার পরীক্ষামূলক ব্যবহারের পর কিছু সীমাবদ্ধতাও সামনে এসেছে। প্রধান সমস্যাটি হলো দৃশ্যমানতা; ডিভাইসটি সব সময় স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে না। এর আগে একবার এই ডিভাইসটির পরীক্ষামূলক উদ্যোগ বাতিল করতে হয়েছিল, কারণ সূর্যের তীব্র আলোয় স্ক্রিনটি দেখা কঠিন হয়ে পড়েছিল। গত বৃহস্পতিবারের ম্যাচেও মাঠের দর্শক এবং টেলিভিশনের সামনে থাকা দর্শকরা ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো বুঝতে কিছুটা সমস্যায় পড়েছেন।
এই বিষয়ে ডিয়েগো দে লা পেনা বলেন, ‘এটি এমন একটি প্রকল্প, যাতে উন্নতির সুযোগ রয়েছে। টিভির চেয়ে মাঠে এটি ভালো দেখা গেছে। এখন আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো সব দর্শকের জন্য এর মান উন্নত করা। হলুদ কার্ডকে হলুদ হতে হবে, লাল কার্ডকে লাল হতে হবে এবং মাঠের দর্শক ও টেলিভিশন দর্শকদের কাছে তা পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান হতে হবে।’
রঙের স্পষ্টতা বাড়াতে ডেভেলপাররা বর্তমানে ডিভাইসটির চারপাশে এলইডি লাইটিংসহ বিভিন্ন কারিগরি পরিবর্তন নিয়ে কাজ করছেন। সাকো জানিয়েছেন, ব্র্যান্ডটি ইতিমধ্যে নিবন্ধিত হয়েছে এবং হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের পেটেন্ট নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের ডেভেলপারদের মূল ভিত্তি চীনে।
অনলাইনে এই পরীক্ষামূলক উদ্যোগটি মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। এ প্রসঙ্গে দে লা পেনা বলেন, ‘আমরা নানা ধরনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক মন্তব্য দেখেছি। এমনকি আমরা মিম দেখে হেসেছিও। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষ এটি নিয়ে কথা বলছে। যেকোনো নতুন উদ্ভাবনেই কিছুটা সময় লাগে।’
‘রেফে’র প্রত্যাশা, প্রযুক্তিটিকে আরও পরিশীলিত ও উন্নত করার পর দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবল এবং বিশ্ব ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এই উদ্ভাবনকে স্বীকৃতি দেবে।