আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত তিনটি প্রধান ফরম্যাট প্রচলিত—টেস্ট, ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি। এই তিনটির মূল পার্থক্য মূলত খেলার দীর্ঘতা বা সময়ের ওপর ভিত্তি করে। যেখানে টেস্ট ম্যাচ চলে পাঁচ দিন, ওয়ানডে হয় ৫০ ওভারের এবং টি-টোয়েন্টি খেলা হয় মাত্র ২০ ওভারে।

এখন ক্রিকেটের সবচেয়ে দীর্ঘ এবং সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত এই দুই ফরম্যাটের এক অনন্য সমন্বয়ে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে নতুন এক আয়োজন—'টেস্ট টুয়েন্টি'। নামের সাথে 'টেস্ট' শব্দটি যুক্ত থাকলেও এই ফরম্যাটে পাঁচ দিন ধরে খেলা হবে না। বরং পুরো ম্যাচটি শেষ হবে মাত্র একদিনে এবং মোট খেলা হবে ৮০ ওভার। এই নতুন ফরম্যাটের সবচেয়ে চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হলো, একই দলের হয়ে একসাথে খেলবেন ছেলে ও মেয়েরা। দুই পক্ষের করা রান যোগ করে নির্ধারিত হবে ম্যাচের চূড়ান্ত ফলাফল।

আগামী ১৪ নভেম্বর শ্রীলঙ্কার কলম্বোর সিনহালিজ স্পোর্টস ক্লাব (এসএসসি) মাঠে এই নতুন ফরম্যাটের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে। টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে ২৯ নভেম্বর। আয়োজকদের মতে, ক্রিকেটের চতুর্থ ফরম্যাট হিসেবে পরিচিতি পেতে যাওয়া এই টেস্ট টুয়েন্টির উদ্বোধনী আসরে অংশ নেবেন ১৩ থেকে ২১ বছর বয়সী মোট ১৬০ জন ক্রিকেটার।

টেস্ট টুয়েন্টি টুর্নামেন্টে মোট চারটি মহাদেশীয় দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। প্রতিটি দলে মোট ৪০ জন খেলোয়াড় থাকবেন, যার মধ্যে ২০ জন ছেলে এবং ২০ জন মেয়ে। অর্থাৎ, প্রতিটি দলের জন্য ছেলে ও মেয়েদের আলাদা আলাদা ২০ জনের স্কোয়াড থাকবে।

খেলার নিয়ম অনুযায়ী, একটি ম্যাচে ছেলেদের একাদশ খেলবে ছেলেদের বিপক্ষে এবং মেয়েদের একাদশ খেলবে মেয়েদের বিপক্ষে। তবে প্রচলিত ক্রিকেটের মতো এখানে দুই ম্যাচের ফলাফল আলাদাভাবে হিসাব করা হবে না। দুই ইনিংসে ছেলে ও মেয়েদের করা মোট রান যোগ করে তৈরি হবে দলের একটি সম্মিলিত স্কোর। যে দলের সম্মিলিত রান বেশি হবে, তারাই ম্যাচে জয়লাভ করবে।

উদাহরণস্বরূপ, ধরা যাক একটি দলের মেয়েরা ২০ ওভারে ১২০ রান এবং ছেলেরা ২০ ওভারে ১৮০ রান করেছে। সেক্ষেত্রে দুই ইনিংস মিলিয়ে তাদের মোট স্কোর হবে ৩০০। অন্যদিকে প্রতিপক্ষের মেয়েরা ১০০ এবং ছেলেরা ১৯০ রান করলে তাদের সম্মিলিত স্কোর হবে ২৯০। ফলস্বরূপ, প্রথম দল ১০ রানে জয়ী হবে।

এই বিশেষ নিয়মের ফলে ছেলে ও মেয়েদের পারফরম্যান্স সমানভাবে ম্যাচের ফলাফলে প্রভাব ফেলবে। এক পক্ষের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স অন্য পক্ষের ব্যর্থতা বা কম রানের ঘাটতি পূরণ করতে সক্ষম হবে। আবার কোনো এক পক্ষের খুব কম রান পুরো দলের জয়ের সম্ভাবনাকে কমিয়ে দিতে পারে।

টেস্ট টুয়েন্টির ম্যাচগুলো একদিনের হবে এবং মোট ৮০ ওভার খেলা হবে। তবে পুরো ম্যাচে একই বল বা পোশাক ব্যবহার করা হবে না। প্রথম ৪০ ওভার খেলা হবে দিনের আলোয়, লাল বলে এবং সাদা পোশাকে। আর পরবর্তী ৪০ ওভার অনুষ্ঠিত হবে ফ্লাডলাইটের আলোয়, সাদা বলে এবং রঙিন পোশাকে। তবে দুই পর্বের মাঝে রানের হিসাব নতুন করে শুরু হবে না; প্রথম ৪০ ওভারের রান পরের পর্বের স্কোরের সাথে যুক্ত থাকবে। অর্থাৎ, দুই পর্ব মিলিয়েই নির্ধারিত হবে চূড়ান্ত জয়-পরাজয়।

ছেলে ও মেয়েদের ইনিংস হবে ২০ ওভারের। বোলিংয়ের ক্ষেত্রেও আলাদা নিয়ম থাকবে—ছেলেরা বল করবেন ছেলেদের বিপক্ষে এবং মেয়েরা বল করবেন মেয়েদের বিপক্ষে। প্রতিটি একাদশে সর্বোচ্চ পাঁচজন বোলার ব্যবহার করা যাবে এবং একজন বোলার সর্বোচ্চ ছয় ওভার করতে পারবেন। অধিনায়ক চাইলে ইনিংসের দশম ওভার শেষ হওয়ার আগেই এই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

টসের নিয়মেও যুক্ত করা হয়েছে নতুন মাত্রা। টসের মাধ্যমে শুধু এটি নির্ধারিত হবে না যে কোন দল আগে ব্যাটিং করবে, বরং কোন দলের মেয়েদের একাদশ আগে খেলবে নাকি ছেলেদের একাদশ—তা-ও নির্ধারিত হবে টসের মাধ্যমে।

টেস্ট টুয়েন্টির মূল লক্ষ্য হলো ছেলে ও মেয়েদের ক্রিকেটকে একই প্রতিযোগিতার আওতায় নিয়ে আসা। দুই পক্ষের পারফরম্যান্সকে একই স্কোরবোর্ডে যুক্ত করার মাধ্যমে ক্রিকেটে সমান অংশগ্রহণ এবং সমান গুরুত্ব নিশ্চিত করতে চান আয়োজকেরা। টুর্নামেন্টটির প্রতিষ্ঠাতা গৌরব বাহিরওয়ানি বলেন, “ছেলেদের ও মেয়েদের পারফরম্যান্স যেন সমানভাবে দলের ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখে, সে লক্ষ্যেই নতুন ফরম্যাটটি তৈরি করা হয়েছে।”

উদ্বোধনী আসরের জন্য মাঠের ট্রায়াল এবং অনলাইন বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ১৬০ জন খেলোয়াড়কে নির্বাচন করা হয়েছে। খেলোয়াড় বাছাইয়ের দায়িত্বে থাকা গ্লোবাল সিলেকশন কমিটির প্রধান হলেন ভারতের কোচ রাজকুমার শর্মা। টুর্নামেন্টের উপদেষ্টা বোর্ডে রয়েছেন কিংবদন্তি ক্রিকেটার এবি ডি ভিলিয়ার্স, ম্যাথু হেইডেন এবং স্যার ক্লাইভ লয়েড। পুরো পরিচালন কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকবেন মাইক ফোর্ডহ্যাম।

আগামী ১৪ নভেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া এই টুর্নামেন্টের ম্যাচগুলো সরাসরি সম্প্রচার করবে সনি স্পোর্টস নেটওয়ার্ক।