চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও এলাকার হাজীপাড়ায় এক চা দোকানের সামনে বসেছিলেন ইট-বালুর ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিন। ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে এসে থামে কালো রঙের একটি নোহা মাইক্রোবাস। গাড়িটি থামার পরপরই সেখান থেকে কয়েকজন যুবক নেমে আসেন এবং তাঁদের ব্যাগে রাখা অস্ত্র বের করে সরাসরি আফতাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেও হামলাকারীরা থামেননি; মাটিতে পড়ে থাকা আফতাবের শরীর লক্ষ্য করে আরও গুলি চালানো হয়। এরপর আরও ৮ থেকে ১০ মিনিট ধরে তারা এলাকায় ফাঁকা গুলি ছুড়তে থাকেন, যাতে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই আতঙ্ক সৃষ্টি করেই তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার প্রায় দুই বছর পর গত বুধবার আদালতে দাখিল করা মামলার অভিযোগপত্রে এই বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে। চান্দগাঁও থানা-পুলিশ চট্টগ্রাম আদালতে এই মামলার অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে। পুলিশি তদন্তে জানা গেছে, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারী মো. সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের নেতৃত্বে এই হামলা চালানো হয়। এই ঘটনায় ছোট সাজ্জাদ, মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন এবং বোরহান উদ্দিনসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে।

তদন্তকারী পুলিশের দাবি, ইট-বালুর ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যেই পূর্বপরিকল্পিতভাবে আফতাবকে হত্যা করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজে হামলাকারীদের হাতে অস্ত্র দেখা গেলেও, পুলিশ এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কোনো অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি।

নিহত আফতাবের বয়স ছিল ২৭ বছর। তিনি ছিলেন চান্দগাঁও হাজীপাড়ার বাসিন্দা মো. মুসার পুত্র এবং নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

সিসিটিভি ফুটেজে হত্যার দৃশ্য

মামলার অভিযোগপত্রের সাথে সংযুক্ত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে হাজীপাড়ার ওমর ফারুকের চায়ের দোকানের সামনে কালো রঙের নোহা মাইক্রোবাসটি এসে থামে। সেই সময় রাস্তায় রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছিল এবং পথচারীরা হেঁটে যাচ্ছিলেন। আশপাশের দোকানপাট ও বাড়িঘরেও মানুষের উপস্থিতি ছিল।

কয়েক মিনিট পর মাইক্রোবাস থেকে পাঁচ-ছয়জন যুবক নামেন। তাঁদের কাঁধে থাকা ব্যাগ থেকে অস্ত্র বের করে দোকানের সামনে বসে থাকা আফতাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। গুলিতে আফতাব মাটিতে লুটিয়ে পড়লেও হামলাকারীরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো অব্যাহত রাখেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আফতাবের ঊরু ও পায়ে পরপর চারটি গুলি লাগে। প্রকাশ্য এই গোলাগুলির ঘটনায় এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আতঙ্কিত লোকজন চারদিকে ছোটাছুটি শুরু করেন।

ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আফতাবের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পরও হামলাকারীরা থামেননি। তারা আরও আট থেকে দশ মিনিট ধরে ফাঁকা গুলি ছুড়তে থাকেন যাতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এমনকি মাইক্রোবাসে করে চলে যাওয়ার সময়ও তারা গুলি ছুড়ছিলেন।

ঘটনার একজন প্রত্যক্ষদর্শী ও সাক্ষী স্থানীয় এক দোকানদার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “হামলাকারীদের হাতে অস্ত্র দেখে এবং গুলির শব্দ শুনে ভয়ে কেউ এগিয়ে আসেননি। ঘটনার পর যাতে কেউ তাঁদের ধাওয়া করার সাহস না পান, সে জন্য ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে চলে যান তাঁরা।”

সাজ্জাদের ১১ অনুসারীর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র

পুলিশের অভিযোগপত্র অনুযায়ী, বিদেশে পলাতক বড় সাজ্জাদের অনুসারী ছোট সাজ্জাদের নেতৃত্বে এই হত্যাকাণ্ডে মোট ১১ জন অংশ নিয়েছেন। আসামিদের তালিকায় রয়েছেন মো. হাসান, মোহাম্মদ ওরফে ভাতিজা মোহাম্মদ, খোরশেদ আলম চৌধুরী, মো. হেলাল, মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন, বোরহান উদ্দিন, ইলিয়াস হোসেন, মো. এমরান, শিহাব উদ্দিন ও সাইফুল ইসলাম।

আসামিদের মধ্যে বোরহান উদ্দিন ও মোহাম্মদ বর্তমানে জামিনে মুক্ত আছেন, বাকিরা কারাগারে। গত ২৯ জুলাই যশোর হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশি তদন্তে জানা গেছে, ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর ডেভিড ইমন তাঁর দলের নেতৃত্ব দেন। সাজ্জাদের নির্দেশে মুঠোফোনে চাঁদা চেয়ে হুমকি দেওয়া হতো এবং চাঁদা না দিলে নির্মাণাধীন ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গুলি চালানো হতো। এই চাঁদার টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে সাজ্জাদের কাছে পাঠানো হতো বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে সাজ্জাদ আলী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এই খুনের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তাঁর এক আত্মীয়কেও এ মামলায় ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ফাঁসানো হয়েছে।

ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ

পুলিশের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ইট-বালুর ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আফতাবকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। তবে নিহত আফতাবের পরিবারের সদস্যদের দাবি ভিন্ন। তাঁদের ভাষ্যমতে, সন্ত্রাসী সাজ্জাদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালেখি করতেন আফতাব। ইট-বালুর ব্যবসা শুরু করার পর থেকেই তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করা হতো। এই বিষয়ে হত্যাকাণ্ডের প্রায় দুই মাস আগেই তাঁরা আদালতে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। তাঁদের অভিযোগ, পুলিশ তখন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার হয়নি

হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে শটগানের কার্তুজ উদ্ধার করে। সিআইডির চট্টগ্রামের ব্যালিস্টিক বিশারদ শাকেরুল আলম সেগুলোর পরীক্ষা করে মত দেন যে, কার্তুজগুলো ১২ বোরের শটগানের।

চান্দগাঁও থানা-পুলিশ ছোট সাজ্জাদ ও ডেভিড ইমনসহ গ্রেপ্তার আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও কোনো অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি। যদিও সিসিটিভি ফুটেজে তাঁদের হাতে অস্ত্র দেখা গেছে। মামলার সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা চান্দগাঁও থানার এসআই শরিফুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এজাহারের বাইরে তদন্তে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদেরও আসামি করা হয়েছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও আসামিরা অস্ত্রের বিষয়ে কোনো তথ্য দেননি। এ কারণে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি।”

নিহত আফতাবের বাবা মো. মুসা নগরের জুবিলী রোড এলাকার একটি দোকানের কর্মচারী। ছেলের মৃত্যুর প্রায় দুই বছর পর তদন্তের ধীরগতি ও অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মুক্তকণ্ঠকে মুসা বলেন, “বারবার তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছেন। একটি অস্ত্রও উদ্ধার হয়নি। কী আর বিচার হবে?”

ভয়ে আছেন কি না, জানতে চাইলে মামলার বাদী মুসা এ বিষয়ে আর কিছু বলতে রাজি হননি।