পণ্য বিক্রয় কার্যক্রমে নিয়োজিত সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ডিজিটাল রূপান্তরের উদ্যোগটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় পণ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি হচ্ছে কি না, ব্যবসায়ীরা লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন কি না এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীরাই পণ্য পাচ্ছেন কি না—তা খতিয়ে দেখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ এই বিষয়ে তাগিদ দিয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার আর্মি গলফ ক্লাবের গলফ গার্ডেনে ‘ট্রেড উইথ টিসিবি’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “শুধু ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করলেই হবে না, এর কার্যকারিতাও নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।”
টিসিবি আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান খালেদ হোসেন মাহবুব এবং বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক ও অধ্যাপক বদরুন নেসা আহমেদ।
অনুষ্ঠানে নাজনীন আহমেদ উল্লেখ করেন যে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং নিম্ন প্রবৃদ্ধির বর্তমান সময়ে সরবরাহব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো অত্যন্ত প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে টিসিবির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, দরিদ্রতম মানুষের কাছে সঠিক সময়ে পণ্য পৌঁছানো নিশ্চিত না হলে সহায়তার মূল লক্ষ্য অর্জিত হবে না।
তিনি আরও বলেন, টিসিবির কার্যক্রমের পরিধি আরও বাড়ানো এবং তালিকায় নতুন পণ্য অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। কারণ দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে থাকা অনেক মানুষ অর্থনৈতিক ধাক্কায় যেকোনো সময় দরিদ্র হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন। তাঁদেরও সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার ক্ষেত্রে টিসিবি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, “টিসিবির কার্ডের কার্যকারিতা নিয়মিত পরিমাপ করতে হবে। শুধু সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিলে হবে না, ভোক্তাদের কাছ থেকেও জানতে হবে তাঁরা কীভাবে সুবিধা পাচ্ছেন।” ডিজিটাল ব্যবস্থা যেন দীর্ঘমেয়াদে অকার্যকর হয়ে না পড়ে, সেজন্য যথাযথ নজরদারি প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
বছরে ৮০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের দাবি
মূল প্রবন্ধে জানানো হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিজিটাল কার্ড চালুর মাধ্যমে ডিলার থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে টিসিবি। ডিলারদের কাছ থেকে সরাসরি ব্যাংকে অর্থ জমা নেওয়ার ফলে বছরে প্রায় ৬০ কোটি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। পাশাপাশি নিজস্ব গুদাম ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আরও ২০ কোটি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। এই দুই খাত মিলিয়ে বছরে মোট পরিচালন ব্যয় কমছে ৮০ কোটি টাকা। সংস্থাটি এখন পণ্য বিক্রির আয় বাড়িয়ে ভর্তুকির চাপ কমানোর এবং দীর্ঘ মেয়াদে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার পরিকল্পনা করছে।
প্রবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়, যাচাই-বাছাই করে এ পর্যন্ত ৭৯ লাখ ৯০ হাজার প্রকৃত সুবিধাভোগীকে ডিজিটাল তথ্যভান্ডারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৭৩ লাখ ৭ হাজার স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড সক্রিয় করা হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য যাচাই এবং ই-কেওয়াইসি পদ্ধতিতে প্রায় ৫৯ লাখ ভুয়া ও অযোগ্য আবেদন বাতিল করা হয়েছে।
টিসিবির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাণিজ্যিক ঋণের সুদ বাবদ তাদের ব্যয় হয়েছিল ৫৩৩ কোটি টাকা, যা চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কমে প্রায় ১০৬ কোটি টাকায় নামতে পারে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।
৮ হাজার কোটি টাকার পণ্য কেনার পরিকল্পনা
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, চলতি অর্থবছরে ৮ হাজার কোটি টাকার পণ্য কেনার পরিকল্পনা করেছে টিসিবি। এই সময়ে মোট বিক্রয় রাজস্ব ৮৩ শতাংশ বাড়ানো এবং সুবিধাভোগীপ্রতি ভর্তুকি ১৭ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে সাবান, ডিটারজেন্ট, লবণ, চা, আটা ও মসলার মতো পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গ্রাহকসেবা আরও সহজ করতে ‘উপকারী’ নামে একটি স্মার্ট অ্যাপ চালু করেছে টিসিবি। এর মাধ্যমে সুবিধাভোগীরা নিকটস্থ বিক্রয়কেন্দ্রের তথ্য এবং পণ্য পাওয়ার বিজ্ঞপ্তি পাবেন। পণ্য কেনাকাটায় শতভাগ ই-জিপি ব্যবহারের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বাজারদর পর্যবেক্ষণ এবং স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তাসুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
দ্রুত বিল পরিশোধ ও স্বচ্ছ দরপত্র
স্কয়ার টয়লেট্রিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মালিক মোহাম্মদ সাঈদ জানান, আগে বিল জমা দেওয়ার পর অর্থ পেতে দীর্ঘ সময় লাগত, তবে এখন তিন থেকে সাত দিনের মধ্যে তা পরিশোধ করা হচ্ছে। টিসিবির মাধ্যমে স্যানিটারি ন্যাপকিনের মতো স্বাস্থ্য সুরক্ষার পণ্য নারীদের কাছে সহজে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগও দেখছে তাঁর প্রতিষ্ঠান।
টিকে গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির কারণে অর্থনীতিতে চাপের সময় টিসিবিকে কার্যক্রম প্রায় ১০ গুণ বাড়াতে হয়েছে। প্রতিকূলতার মধ্যেও সংস্থাটি সনাতন দরপদ্ধতি থেকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছে। এতে ক্রয়, সরবরাহ ও বিল পরিশোধের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বেড়েছে বলে তিনি জানান।
অস্ট্রেলিয়ার এমসিজি ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মার্ক শ্যান গোল্ডরিকও টিসিবির দরপত্রপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার প্রশংসা করেন। তিনি জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠান অস্ট্রেলিয়া থেকে মসুর ডাল ও ছোলা এবং ব্রাজিল থেকে সয়াবিনজাত পণ্য সরবরাহ করে থাকে।