দেশের কৃষি খাতের আধুনিকায়ন, জমি চাষ ও ধান কাটার প্রযুক্তিবান্ধব পদ্ধতি, সহজ অর্থায়ন, বিক্রয়োত্তর সেবা এবং স্থানীয়ভাবে যন্ত্র সংযোজনের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন মেটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সাদিদ জামিল। মুক্তকণ্ঠের নিজস্ব প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বর্তমান অবস্থা ও চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন।

কৃষি আধুনিকায়নে মেটাল ব্র্যান্ডের ভূমিকা সম্পর্কে সাদিদ জামিল বলেন, “কৃষির যান্ত্রিকীকরণে আমরা শুরু থেকেই কাজ করছি। বর্তমানে জমি তৈরির কাজে দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ জমিতে ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারের মাধ্যমে যান্ত্রিকীকরণ অর্জিত হয়েছে। তবে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের ক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণ এখনো মাত্র ১৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে, যার বাকিটা এখনো সনাতন কিংবা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতেই করা হচ্ছে।”

প্রান্তিক কৃষকদের জন্য প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিয়ে কথা উঠলে তিনি জানান, বড় যন্ত্রপাতির উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ কৃষকদের পক্ষে তা কেনা সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, “১৫ থেকে ৪০ লাখ টাকার ট্রাক্টর বা হারভেস্টার প্রান্তিক কৃষকেরা কিনতে পারেন না। স্থানীয় সেবা প্রদানকারী (এলএসপি) উদ্যোক্তারা এসব যন্ত্র কিনে ভাড়ায় চাষ বা কাটা, মাড়াই ও ঝাড়াই সেবা দেন, যা কৃষকের খরচ ৩০-৪০ শতাংশ কমায়। ব্যাংকঋণ না পাওয়ায় সরবরাহকারী হিসেবে আমরাই উদ্যোক্তাদের কিস্তির মাধ্যমে অর্থায়ন করছি। ব্যাংকের কৃষিঋণের আওতায় ৩-৫ শতাংশ সুদে উদ্যোক্তাদের সরাসরি ঋণ দিলে কৃষিতে প্রযুক্তি আরও দ্রুত প্রসার ঘটবে।”

আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন ও সংযোজন পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “হঠাৎ করেই ট্রাক্টর বা হারভেস্টারের মতো ভারী যন্ত্র দেশে প্রস্তুত করা কঠিন। তবে শুরুতে অ্যাসেম্বল বা সংযোজন করে পরবর্তী সময়ে উৎপাদনে যাওয়ার চিন্তাভাবনা আমাদের রয়েছে। পাশাপাশি পাওয়ার টিলার বা ছোট হ্যান্ড টিলারের মতো হালকা যন্ত্রপাতিগুলো দেশীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে তৈরির সুযোগ রয়েছে।”

যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ও দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়ে সাদিদ জামিল জানান, তাদের নিজস্ব একটি ট্রেনিং সেন্টার রয়েছে। সেখানে ৩০০ থেকে ৪০০ জন মেকানিককে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং প্রশিক্ষণের জন্য চীন ও ভারত থেকে ইনস্ট্রাক্টর আনা হয়। এছাড়া খুচরা যন্ত্রাংশ দ্রুত পৌঁছে দিতে আলাদা কোম্পানি গঠন করা হয়েছে এবং দেশজুড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ জন ডিলার কাজ করছেন।

স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে তিনি বলেন, “চালকহীন ট্রাক্টর বা আইওটির মতো প্রযুক্তি ব্যবহার বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখনো কিছুটা আগাম মনে হয়। আমাদের দেশে কৃষিজমির আকার ছোট হওয়ায় সেগুলোর উপযোগী মাঝারি আকারের (৮০-১০০ হর্সপাওয়ার) কম্বাইন হারভেস্টার ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার আমরা ব্যাপকভাবে সরবরাহ করে আসছি।”

সরকারি ভর্তুকি ও নীতি সহায়তার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আগে হাওর ও উপকূলে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত সরকারি ভর্তুকি দেওয়া হলেও তা বন্ধ থাকায় ধাক্কা এসেছে। আগামী ৫-১০ বছর আবার ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে জমি আবাদের মতো ফসল হারভেস্টিংয়েও ৯৮ শতাংশ সফলতা আসবে।”

সবশেষে কৃষকের গড় বয়স বৃদ্ধি এবং শ্রমিক সংকটের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মেটালের পরিকল্পনা জানিয়ে তিনি বলেন, “কৃষকদের গড় বয়স ৫০ ছুঁয়েছে এবং তরুণেরা কৃষি পেশায় আসছে না। ফলে যন্ত্র ছাড়া জমি অনাবাদি থাকবে। মেটাল আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশে যন্ত্র সংযোজনের পাশাপাশি উচ্চ ফলনশীল সবজি ও ধানের বীজ উদ্ভাবন করে কৃষিকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে।”