যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী আবেদন করেন। তবে তাদের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকে তিনটি—ভর্তির সুযোগ পাওয়ার উপায় কী, ফান্ডিং পাওয়া কি সত্যিই সম্ভব এবং পড়াশোনার সামগ্রিক খরচ কত হতে পারে? এই বিষয়গুলোর বাস্তবসম্মত উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, এখানে উল্লিখিত আর্থিক হিসাবগুলো সাধারণ ধারণা মাত্র; বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভাগভেদে এই অংকের পরিবর্তন হতে পারে।

ভর্তির আবেদন প্রক্রিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির আবেদন সাধারণত তাদের নিজস্ব অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে করতে হয়। আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্রের মধ্যে রয়েছে একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট ও সনদপত্র, ইংরেজি ভাষার দক্ষতার প্রমাণপত্র (যেমন: টোয়েফল, আইইএলটিএস বা ডুওলিঙ্গো ইংলিশ টেস্ট; তবে বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে গ্রহণযোগ্যতা ভিন্ন হয়), স্টেটমেন্ট অব পারপাস (SOP), দুই থেকে তিনটি সুপারিশপত্র, জীবনবৃত্তান্ত বা সিভি এবং জিআরই বা জিম্যাট স্কোর (যদি সংশ্লিষ্ট বিভাগ দাবি করে)। বর্তমানে অনেক প্রোগ্রামে জিআরই বা জিম্যাট ঐচ্ছিক করা হয়েছে অথবা প্রয়োজন হয় না, তাই প্রতিটি বিভাগের শর্তাবলি আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।

আবেদন প্রক্রিয়ার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো আবেদন ফি। সাধারণত প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন ফি ৫০ থেকে ১১০ মার্কিন ডলারের মধ্যে হয়ে থাকে। ফলে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করলে শুধুমাত্র এই খাতেই প্রায় এক হাজার ডলার খরচ হয়ে যেতে পারে।

সফল আবেদনের কৌশল

ভর্তির ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ফান্ডিং পাওয়ার লড়াইয়ে স্টেটমেন্ট অব পারপাস এবং সুপারিশপত্র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আবেদনকারীকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে কেন তিনি ওই নির্দিষ্ট বিভাগে পড়তে আগ্রহী, কোন অধ্যাপকের গবেষণার সাথে তার আগ্রহের মিল রয়েছে এবং তার পূর্ব অভিজ্ঞতা কী। সাধারণ বা ঢালাও লেখা এখানে কার্যকর হয় না; প্রতিটি আবেদন হতে হবে সুনির্দিষ্ট ও ব্যক্তিগত।

অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ ও ফান্ডিংয়ের ধরন

যুক্তরাষ্ট্রে ‘ফান্ডিং’ বলতে মূলত তিন ধরনের সহায়তাকে বোঝানো হয়:

১. রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ (আরএ): কোনো নির্দিষ্ট অধ্যাপকের গবেষণা প্রকল্পে কাজ করার বিনিময়ে শিক্ষার্থী টিউশন ফি ছাড় এবং মাসিক ভাতা পান। এই অর্থ সাধারণত অধ্যাপকের গবেষণা অনুদান থেকে আসে। তাই ভর্তির আগেই সংশ্লিষ্ট অধ্যাপকের সাথে যোগাযোগ করে গবেষণার আগ্রহ জানানো ফলপ্রসূ হতে পারে।

২. টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ (টিএ): স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদানে সহায়তা, ল্যাব পরিচালনা বা খাতা দেখার মতো দায়িত্ব পালন করতে হয়। এর বিনিময়ে টিউশন ফি ছাড় ও ভাতা দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে টিএ পদের জন্য ইংরেজি বলার দক্ষতার আলাদা মূল্যায়ন বা পরীক্ষা নেওয়া হয়।

৩. গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ (জিএ): বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যালয়, লাইব্রেরি বা অন্যান্য বিভাগে কাজ করাকে জিএ বলা হয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে আরএ এবং টিএ-কেও সামগ্রিকভাবে জিএ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

সাধারণত এই পদগুলোতে সপ্তাহে প্রায় ২০ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় স্বাস্থ্যবিমার একটি অংশ বহন করে, তবে প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী এটি ভিন্ন হতে পারে।

ফান্ডিংয়ের বাস্তবতা: পিএইচডি বনাম মাস্টার্স

ফান্ডিং পাওয়ার ক্ষেত্রে পিএইচডি এবং মাস্টার্স প্রোগ্রামের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির সময়ই টিউশন ফি ছাড় এবং মাসিক স্টাইপেন্ডের প্রস্তাব দেয়। অন্যদিকে, কোর্সভিত্তিক মাস্টার্স প্রোগ্রামে সম্পূর্ণ ফান্ডিং পাওয়া বেশ কঠিন। থিসিসভিত্তিক মাস্টার্সে সুযোগ কিছুটা বেশি থাকে। অনেকে পড়াশোনার মাঝামাঝি সময়ে আরএ বা টিএ পদ পান, তবে এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই মাস্টার্স আবেদনকারীদের জন্য পরামর্শ হলো, ফান্ডিং না পাওয়ার সম্ভাবনা মাথায় রেখে বিকল্প আর্থিক পরিকল্পনা করে রাখা।

স্টাইপেন্ড ও জীবনযাত্রার ব্যয়

স্টাইপেন্ডের পরিমাণ বিশ্ববিদ্যালয়, বিভাগ এবং শহরের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। সাধারণ ধারণা অনুযায়ী, পিএইচডি স্টাইপেন্ড বছরে ২৫ হাজার থেকে ৪৫ হাজার মার্কিন ডলারের মধ্যে হয়ে থাকে। নামী প্রতিষ্ঠান বা ব্যয়বহুল শহরে এই অঙ্ক আরও বেশি হতে পারে। মাস্টার্স পর্যায়ের অ্যাসিস্ট্যান্টশিপে সাধারণত ভাতার পরিমাণ কম হয়। তবে মনে রাখতে হবে, উচ্চ স্টাইপেন্ড মানেই অধিক সঞ্চয় নয়। ব্যয়বহুল শহরে ভাড়ার পেছনেই স্টাইপেন্ডের বড় অংশ চলে যায়। তাই স্টাইপেন্ডের সাথে শহরের জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনা করা জরুরি।

সামগ্রিক খরচের হিসাব

টিউশন ফি: সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বার্ষিক খরচ প্রায় ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার ডলার। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ব্যয় ৪০ হাজার থেকে ৭০ হাজার ডলার বা তার বেশি হতে পারে।

জীবনযাত্রার ব্যয়: বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণত বছরে ১২ হাজার থেকে ২৫ হাজার ডলার বা তার বেশি খরচ ধরে থাকে। নিউইয়র্ক, বোস্টন বা ক্যালিফোর্নিয়ার মতো বড় শহরে খরচ বেশি এবং ছোট শহরগুলোতে তুলনামূলক কম।

অন্যান্য খরচ: আবেদন ফি, পরীক্ষার ফি, ভিসা ও সেভিস ফি, স্বাস্থ্যবিমা, বিমানভাড়া, প্রাথমিক আবাসন অগ্রিম, শীতবস্ত্র এবং বইয়ের খরচ।

ফান্ডিং না থাকলে একজন মাস্টার্স শিক্ষার্থীর বার্ষিক মোট খরচ ৩৫ থেকে ৮০ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে। সঠিক তথ্যের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কস্ট অব অ্যাটেনডেন্স’ যাচাই করা উচিত।

ভিসা সংক্রান্ত নতুন নিয়ম: ২০২৬ সালের পরিবর্তন

এফ-ওয়ান শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসছে। ২০২৬ সালের ১৭ জুলাই মার্কিন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ (ডিএইচএস) একটি চূড়ান্ত বিধি প্রকাশ করেছে, যার ফলে দীর্ঘদিনের ‘ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস’ ব্যবস্থাটি তুলে দেওয়া হয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে অধিকাংশ এফ-ওয়ান শিক্ষার্থী কোর্সের পুরো মেয়াদে অনির্দিষ্ট সময়ের বদলে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য প্রবেশের অনুমতি পাবেন। এর ফলে কোর্সের মেয়াদ বৃদ্ধি, স্কুল পরিবর্তন, বিষয় পরিবর্তন বা পিএইচডি দীর্ঘায়িত হলে ইউএসসিআইএসে ফি দিয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে হবে। ওপিটির সময় ও প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে।

দীর্ঘমেয়াদি পিএইচডি করতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের ভর্তির পর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কার্যালয়ের (ডিএসও) সাথে এই বিষয়ে কথা বলে নেওয়া উচিত। ওপিটি সংক্রান্ত আরও পরিবর্তনের আলোচনা চলছে, তাই অফিসিয়াল সূত্র থেকে হালনাগাদ তথ্য রাখা জরুরি।

বিশেষ পরামর্শ

১. আবেদনের প্রক্রিয়া অন্তত ৮ থেকে ১২ মাস আগে শুরু করুন।
২. মাস্টার্সের ক্ষেত্রে ফান্ডিং সম্ভাবনা আছে এমন বিভাগ খুঁজুন এবং পিএইচডির ক্ষেত্রে অধ্যাপকের গবেষণার সাথে নিজের আগ্রহ মেলান।
৩. আবেদন তালিকায় কিছু ‘স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়’, কিছু মাঝারি এবং কিছু নিরাপদ বিকল্প রাখুন।
৪. ফান্ডিং না পাওয়ার ক্ষেত্রে বিকল্প আর্থিক উৎসের পরিকল্পনা আগে থেকেই করে রাখুন।
৫. যারা ফান্ডিং বা ভিসার ‘শতভাগ নিশ্চয়তা’ দেওয়ার দাবি করেন, তাদের থেকে সতর্ক থাকুন।

সিএইচএস এডুকেশন যেভাবে সহায়তা করে

শিক্ষার্থীর একাডেমিক প্রোফাইল, লক্ষ্য ও বাজেট অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগ নির্বাচন, আবেদন প্রস্তুতি, ফান্ডিং পরিকল্পনা এবং ভিসা সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতিতে সিএইচএস এডুকেশন পাশে থাকে। ভর্তি ও ভিসার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও দূতাবাসের হাতে থাকলেও, প্রস্তুতি যেন সুচিন্তিত হয় তা নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য।

লেখক: নাজমুল হাসান রাজু, উচ্চশিক্ষা পরামর্শক; সিইও, সিএইচএস এডুকেশন লিমিটেড