একটি ছোট দোকান, তবে জায়গার তুলনায় সেখানে মাটির হাঁড়ি, পাতিল, ঢাকনা আর মটকার আধিক্য অনেক বেশি। সারিবদ্ধভাবে একটির পাশে আরেকটি সাজানো এই পণ্যগুলো। পটিয়ার থানার হাটের পাশে অবস্থিত এই দোকানে বসে থাকেন মো. নাসির উদ্দিন। পরিবারের প্রায় এক শ বছরের ঐতিহ্যের এই ব্যবসার দায়িত্ব এখন তাঁর কাঁধে।
দোকানের বর্তমান ঠিকানার কথা বলতে গিয়ে নাসির উদ্দিন স্মৃতিচারণ করেন পুরোনো থানার হাটের কথা। তিনি জানান, একসময় পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে একটি বটগাছের নিচে বসত হাট। ঠিক তার পাশেই ছিল তাঁদের দোকান। নাসিরের দাদা আবদুল হাকিম সেখানে নিজের হাতেই মাটির হাঁড়ি-পাতিল তৈরি করতেন এবং তা বিক্রিও করতেন। তাঁর তৈরি পণ্যের গুণগত মানের কারণে দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতারা আসতেন জিনিস কিনতে।
সময়ের আবর্তে হাটের ঠিকানা বদলেছে, আর সেই সঙ্গে বদলেছে দোকানের অবস্থানও। এখন দোকানটি নতুন হাটের পাশে। দাদার পর ব্যবসার হাল ধরেন নাসিরের বাবা সগির আহমদ। ১৯৯৩ সালে আবদুল হাকিমের মৃত্যুর পর তিনি এই ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা চালিয়ে যান। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে বাবার মৃত্যুর পর ব্যবসার পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন নাসির।
তিন প্রজন্মের এই ব্যবসা ধরে রাখলেও কাজের ধরনে এসেছে পরিবর্তন। দাদা আবদুল হাকিম নিজেই হাঁড়ি-পাতিল বানাতেন, কিন্তু নাসির এখন আর মাটি দিয়ে পাত্র তৈরি করেন না। তিনি গ্রামের দক্ষ কারিগরদের কাছ থেকে পণ্য কিনে এনে দোকানে বিক্রি করেন। ব্যবসার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি বললেন, “মাসে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি হয়।” খরচ বাদ দিয়ে আয় সন্তোষজনক থাকে বলে তিনি যতদিন সম্ভব এই ব্যবসা চালিয়ে যেতে চান।
নাসিরের বাড়ি পটিয়ার কেলিশহরের ফোরকানিয়া পাড়ায়। এই এলাকার পুরোনো নাম কুমারপাড়া। ৮ অক্টোবর সেখানে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, নাসিরের দোকানে সাজানো মাটির পাত্রগুলোর একটি বড় অংশ তৈরি হয় এই গ্রামেই।
গ্রামে প্রবেশের পর দেখা হয় ৭০ বছর বয়সী নোয়া মিয়ার সঙ্গে। তিনি তখন মাটি পোড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাঁর পাশে ছিলেন স্ত্রী নেসা বেগম। নোয়া মিয়া কানে শুনতে পান না, তাই নেসা বেগমই বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, “কয়েক বছর আগেও মাটির হাঁড়ি-পাতিল বানিয়ে চাহিদা পূরণ করতে পারতেন না।” তবে বর্তমানে মেলামাইনের থালাবাসনের জনপ্রিয়তার কারণে মাটির পণ্যের কাজ কমেছে। কোনো কোনো মাসে তাঁরা প্রায় ২০ হাজার টাকার অর্ডার পান, যা থেকে খরচ বাদে হাতে থাকে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা।
গ্রামের ভেতর হাঁটার সময় দেখা হয় পাখিজা বেগমের সঙ্গে। তিনি দীর্ঘ চার দশক ধরে মাটির পণ্য তৈরি করে আসছেন। মাসে তাঁর গড় আয় প্রায় ১০ হাজার টাকা। তাঁর তৈরি পণ্যগুলোও যায় থানার হাটে নাসিরের দোকানে। পাখিজার ভাষ্যমতে, “আগে গ্রামে শতাধিক ঘরে মাটির তৈজসপত্র তৈরি হতো। এখন এ কাজ করেন হাতে গোনা কয়েকজন।”
নাসির মূলত এই কারিগরদের কাছ থেকেই পণ্য সংগ্রহ করেন। ফলে তাঁর দোকানের বেচাকেনা কেবল পরিবারের পুরোনো ব্যবসার ধারাবাহিকতা নয়, বরং কুমারপাড়ার কারিগরদের তৈরি পণ্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্রাম থেকে ফিরে পুনরায় নাসিরের দোকানে গেলে ছোট জায়গাটিতে সাজানো হাঁড়ি-পাতিলের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, এই পারিবারিক ব্যবসাটি দুটি দিক থেকে বদলেছে। প্রথমত, হাটের পরিবর্তনের সাথে সাথে বদলেছে দোকানের ঠিকানা এবং দ্বিতীয়ত, নিজে পণ্য তৈরির পরিবর্তে নাসির এখন কারিগরদের কাছ থেকে পণ্য কেনাবেচার ব্যবসায় নিয়োজিত। তবে দাদার শুরু করা সেই ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাটি এখনো নাসিরের হাতেই সচল রয়েছে।