গত দুই-তিন বছরে প্রতিমা তৈরির প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম এবং শ্রমিকদের মজুরি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে প্রতিমাশিল্পীদের প্রকৃত আয় আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।

পাবনার বেড়া উপজেলার মালদাপাড়া গ্রামের প্রতিমাশিল্পী ষষ্ঠী পাল বর্তমানে একটি প্রতিমার মুখের শেষ মুহূর্তের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। তাঁর পাশে সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন ছেলে অমৃত পাল। শৈশব থেকেই বাবার কাছ থেকে এই কারুশিল্পের দীক্ষা নিয়েছেন অমৃত, যার ফলে এখন তিনি বাবার মতোই দক্ষ হয়ে উঠেছেন। বাবা ও ছেলে মিলে এবার মোট ৯টি দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করছেন। এর মধ্যে চারটি বেড়া উপজেলায় এবং বাকি পাঁচটি পাবনা শহর ও সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলায় নির্মাণ করছেন তাঁরা।

গত শুক্রবার বেড়া বাজার কালীমন্দিরে ষষ্ঠী পাল ও অমৃত পালের সঙ্গে কথা হয়। সেখানে তাঁরা ৫৫ হাজার টাকার একটি প্রতিমা তৈরি করছেন। প্রতিমা নির্মাণে এলাকায় তাঁদের যথেষ্ট সুনাম থাকলেও সেই খ্যাতির সাথে আয়ের সামঞ্জস্য নেই। উল্টো গত কয়েক বছরে উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় তাঁদের আর্থিক চাপ বেড়েছে।

বেড়া উপজেলায় ষষ্ঠী পালের মতো সুপরিচিত প্রতিমাশিল্পী রয়েছেন আরও ১৫ জন। তাঁরা মূলত মালদাপাড়া, আমিনপুর ও চরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। এই শিল্পীদের সহায়তায় কাজ করেন আরও ২০ থেকে ২৫ জন কর্মী। তাঁদের তৈরি প্রতিমার ব্যাপক চাহিদা শুধু বেড়া বা পাবনায় নয়, বরং সিরাজগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকাতেও রয়েছে। বিশেষ করে মুখ ও চোখের নিখুঁত কারুকাজ, প্রতিমার সুন্দর গড়ন, হাত-পায়ের সঠিক অনুপাত, রঙের কাজ এবং দেবীর মুখে অনন্য সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলার দক্ষতার কারণে তাঁরা জনপ্রিয়। এছাড়া সময়মতো প্রতিমা বুঝিয়ে দেওয়া এবং আয়োজকদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সুসম্পর্ক তাঁদের চাহিদাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

মালদাপাড়া গ্রামের আরেক প্রবীণ ও খ্যাতিমান প্রতিমাশিল্পী ধনু পাল (৬৬) প্রায় ৫০ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। এবার তিনি বেড়া থেকে পাবনা শহরে গিয়ে ৯টি এবং সুজানগর উপজেলায় ১টি মিলিয়ে মোট ১০টি প্রতিমা তৈরি করছেন।

ধনু পাল বলেন, ‘প্রতিমা তৈরি আমার নেশা। সবাই যখন আমার বানানো প্রতিমা দেখে সম্মান দেখায়, তখন আনন্দ আর গর্বে বুক ভরে ওঠে।’ তিনি আরও জানান, একেক মণ্ডপে একেক ধরনের প্রতিমা তৈরি করতে হয়। পাশাপাশি এক বছরের প্রতিমার সঙ্গে পরের বছরের প্রতিমার যেন কোনো মিল না থাকে, সেদিকেও বিশেষ নজর দিতে হয়। এজন্য প্রতিমা তৈরির আগে অনেক চিন্তা করতে হয়। এটি একটি সৃষ্টিশীল কাজ, যেখানে মেধাকে কাজে লাগাতে হয়। প্রতিমার মুখ, সাজসজ্জা ও পটভূমিসহ সবকিছু তৈরিতেই বেড়ার শিল্পীদের আলাদা দক্ষতা রয়েছে, যার ফলে তাঁদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে।

তবে এই খ্যাতির বিপরীতে আয় বাড়ছে না। ষষ্ঠী পাল জানান, বেড়া বাজার কালীমন্দিরের প্রতিমাটি তৈরি করতে তাঁদের ১২ থেকে ১৫ দিন সময় লাগবে। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, বাঁশ, খড় ও মাটিতে ১০ হাজার, রঙে ৫ হাজার, অন্যান্য উপকরণে ৫ হাজার, শ্রমিকের মজুরিতে ২০ হাজার এবং পরিবহনে ৩ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। সব মিলিয়ে মোট খরচ দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার টাকা।

প্রতিমাশিল্পীদের দাবি, সবকিছুর দাম বেড়েছে। এবার যে মানের প্রতিমা তাঁরা ৫৫ হাজার টাকায় তৈরি করছেন, গত বছর একই ধরনের প্রতিমা তৈরি করেছিলেন ৫০ থেকে ৫২ হাজার টাকায়।

হিসাব অনুযায়ী, ৫৫ হাজার টাকার প্রতিমায় ১২ হাজার টাকা থাকার কথা। কিন্তু এতে বাবা-ছেলের ১২ থেকে ১৫ দিনের শ্রমের মূল্য ধরা হয়নি।

ষষ্ঠী পাল বলেন, ‘বাঁশ, খড়, রং, গয়না, চুলসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে। সব খরচ বাদ দিলে যে টাকা থাকে, তা আমাদের দুজনের শ্রমের দামও নয়।’

শিল্পীরা জানান, দুই-তিন বছর আগে খড়ের দাম ছিল প্রতি মণ ৩০০ টাকা, যা এখন বেড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা হয়েছে। ২০০ টাকার বাঁশের দাম এখন ৪০০ টাকা। ৫০০ টাকার গয়নার সেট কিনতে এখন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা খরচ হয়। পাটের তৈরি প্রতিমার মাথার চুলের দাম প্রতি কেজি ৪৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০০ টাকা হয়েছে। অথচ গত বছর ৫০ থেকে ৫২ হাজার টাকায় যে মানের প্রতিমা তৈরি করা হতো, এবার তার দাম বেড়ে ৫৫ হাজার টাকা হলেও খরচ বৃদ্ধির কারণে লাভ কমছে।

অমৃত পাল বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে বাবার সঙ্গে কাজ করতে করতে শিখেছি। কাজটা আমাদের কাছে শুধু ব্যবসা নয়, শিল্পও। কিন্তু খরচ যেভাবে বাড়ছে, প্রতিমার দাম সেভাবে না বাড়লে এ পেশায় টিকে থাকা কঠিন।’

বেড়ার প্রতিমাশিল্পীদের খ্যাতি আশপাশের কয়েকটি জেলাজুড়ে বিস্তৃত। এই কারণে অনেকেই এলাকার বাইরে গিয়ে প্রতিমা বানিয়ে সুনাম অর্জন করছেন। তবে উপকরণের দাম বাড়ায় তাঁদের প্রকৃত লাভ খুব একটা থাকছে না।

দুর্গাপূজার সময় ছাড়া বছরের বাকি সময়ে এই শিল্পীরা মাটির সামগ্রী তৈরি করেন। তবে এসব সামগ্রীর আগের মতো চাহিদা নেই। ফলে সারা বছর মাটির জিনিস তৈরি করে এখন আর তাঁদের সংসার চলে না। মূলত দুর্গাপূজার কয়েক মাসের প্রতিমা তৈরির আয়ের ওপরই তাঁদের জীবনযাত্রা নির্ভরশীল।

বেড়া উপজেলার কেন্দ্রীয় বারোয়ারি হরিবাড়ি মন্দির কমিটির সভাপতি সমীরণ চৌধুরী বলেন, ‘বেড়ার প্রতিমাশিল্পীদের খ্যাতি আশপাশের কয়েকটি জেলাজুড়ে। এ কারণে তাঁদের অনেকেই বেড়ার বাইরে গিয়ে প্রতিমা বানিয়ে সুনাম আনছেন। আমাদের মন্দিরে ষষ্ঠী পাল ও তাঁর ছেলে অমৃত পাল প্রতিমা বানাচ্ছেন। দুজনেই অসাধারণ প্রতিমাশিল্পী। কয়েকজন শিল্পীর সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, এবার উপকরণের দাম বাড়ায় তাঁদের খুব একটা লাভ থাকছে না।’