‘সন্দেশের গন্ধে বুঝি দৌড়ে এল মাছি?’—সুকুমার রায়ের কবিতার এই পঙ্ক্তিটি মনে পড়ে পটিয়ার আদর্শ মিষ্টি ভান্ডারে প্রবেশ করলে। তবে বাস্তব চিত্রটি ভিন্ন; এখানে মিষ্টির মোহনীয় ঘ্রাণে মাছির চেয়ে ক্রেতাদের আনাগোনাই অনেক বেশি। কেউ আসছেন ছানার মিষ্টির স্বাদ নিতে, কেউবা সংগ্রহ করছেন স্পঞ্জের মিষ্টি। আবার অনেকে বাড়ি ফেরার পথে পরিবারের জন্য পছন্দমতো হরেক পদের মিষ্টি কিনে নিচ্ছেন। বিশেষ করে হাটের দিনে এই দোকানে এমন ব্যস্ত দৃশ্য অত্যন্ত সাধারণ বিষয়।
দোকানে পা রাখলেই নাকে ভেসে আসে মিষ্টির মনমুগ্ধকর সুবাস। সামনের আলমারিতে সুন্দর করে সাজানো রয়েছে লাড্ডু, নারকেলের নাড়ু, ল্যাংচা, জিলাপি ও নিমকি। বড় গামলায় রসে ভেজা রসগোল্লাগুলো ক্রেতাদের আকর্ষণ করে। দোকানের ভেতরেই কয়েকটি টেবিল ও চেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে ক্রেতারা বসে মিষ্টি খেতে পারেন। আর ঠিক তার পেছনেই রয়েছে মিষ্টি তৈরির কারখানা।
দোকানটির আয়তন ছোট এবং সাজসজ্জাও বেশ সাদামাটা। তা সত্ত্বেও এখানে ক্রেতাদের আসা-যাওয়া লেগেই থাকে। কেউ টেবিলে বসে তৃপ্তি করে মিষ্টি খাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ তাদের পছন্দের পদগুলো প্যাকেট করিয়ে নিচ্ছেন; এই চিরচেনা দৃশ্যই আদর্শ মিষ্টি ভান্ডারের বৈশিষ্ট্য।
সেখানে ছানার মিষ্টির স্বাদ নিচ্ছিলেন মোহাম্মদ আলী। একটি মিষ্টি মুখে দিয়ে অন্যটির দিকে হাত বাড়িয়ে তিনি বলেন, ‘এ দোকানের ছানার মিষ্টির স্বাদ অতুলনীয়। তুলতুলে মিষ্টি একটা-দুইটা নয়, কয়েক হালি না খেলে তৃপ্তি মেটে না। এক কামড়ে পুরো গলে যায়। এখানের নিমকির স্বাদও আলাদা।’
দোকানের এক পাশে শান্ত হয়ে বসে ছিলেন অমল দত্ত। তিনি নিবিষ্ট মনে ক্রেতাদের আসা-যাওয়া দেখছিলেন। তাঁর কাছে এই দৃশ্য মোটেও নতুন নয়। দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই দোকানের চারপাশেই তাঁর জীবন অতিবাহিত হয়েছে। বর্তমানে যাঁরা মিষ্টি কিনতে আসছেন, তাঁদের অনেকের সাথেই তাঁর দীর্ঘদিনের পুরোনো পরিচয় রয়েছে। পাশাপাশি নতুন ক্রেতাদের সাথেও তাঁর পরিচয় হয়। দোকানের এই চেনা ও অচেনা মুখের ভিড়ের মধ্যেই কেটে গেছে তাঁর পুরো কর্মজীবন।
আদর্শ মিষ্টি ভান্ডারের যাত্রা শুরু হয়েছিল ৬৪ বছর আগে। অমল দত্তর বাবা হরিমোহন দত্ত এই দোকানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই সময়ে থানার হাট পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের সামনের বটগাছের নিচে বসত এবং সেখানেই ছিল এই দোকান। হাটবারে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে তাঁদের অত্যন্ত ব্যস্ত থাকতে হতো। সেই স্মৃতি রোমন্থন করে অমল দত্ত বলেন, ‘থানার হাট যখন বসত, তখন সময় পাওয়া যেত না। ক্রেতার ভিড় লেগেই থাকত। হাট সরে যাওয়ার পর ভিড় কিছুটা কমেছে।’