এক বছরের ব্যবধানে দেশের মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা চার লাখের বেশি হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে স্বতন্ত্র কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। তবে এর বিপরীতে মাদ্রাসা এবং ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের এই নিম্নমুখী প্রবণতা দেশের শিক্ষা পরিকল্পনা এবং শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) প্রকাশিত 'বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৫' প্রতিবেদনের তথ্যের সঙ্গে পূর্ববর্তী বছরের তথ্যের তুলনা করে এই চিত্র পাওয়া গেছে। গত জুন মাসে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে মূলত মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি সম্পূরক তথ্য হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষার পরিসংখ্যানও প্রকাশ করেছে ব্যানবেইস।
মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি। তবে শিক্ষক এবং শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মতে, করোনা মহামারির কারণে সৃষ্ট শিখন ঘাটতি, সাম্প্রতিক বিভিন্ন পরিস্থিতি, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ এবং পরিবারের চরম আর্থিক সংকটের কারণে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়ে থাকতে পারে।
ব্যানবেইসের একজন কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষা পরিসংখ্যানের প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এখানে আলাদাভাবে কোনো কারণ বিশ্লেষণ করা হয়নি।”
অন্যদিকে, ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিতির কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছিল। ১ হাজার ৩৫০ জন অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর তথ্য সংগ্রহ করে বোর্ড জানতে পারে, এসব পরীক্ষার্থীর প্রায় ৪১ শতাংশের (৫৪৯) বিয়ে হয়ে গেছে। এদের ৯৭ শতাংশই ছিল ছাত্রী।
স্কুল অ্যান্ড কলেজগুলোতেও একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মাধ্যমিক স্তরসহ মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখন ১৫ লাখ ৩১ হাজারের বেশি, যা আগের বছর ছিল ১৫ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি। অথচ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ হাজার ৫১৪টি থেকে বেড়ে ১ হাজার ৫৫৬টি হয়েছে। স্কুল অ্যান্ড কলেজগুলোর মধ্যে শুধু মাধ্যমিক স্তরেই শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১১ লাখ ২৮ হাজারের বেশি।
ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, জুনিয়র স্কুলসহ দেশে বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৯ হাজার ২১১টি এবং এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ৭৪ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালে ১৯ হাজার ১১৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৭৮ লাখ ৪৭ হাজার ৫৪৬ জন। অর্থাৎ, এক বছরে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৯৪টি বাড়লেও শিক্ষার্থী কমেছে ৪ লাখ ৮ হাজারের বেশি।
এছাড়া ৫৪৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়, যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭০ হাজারের বেশি। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থী ছিল ৮৬ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি, যা আগের বছর ছিল ৯০ লাখ ৬৩ হাজারের বেশি। অর্থাৎ, এক বছরে এই স্তরে শিক্ষার্থী কমেছে চার লাখের বেশি।
শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন বা বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এলাকাভিত্তিক শিক্ষার্থীর চাহিদা, জনসংখ্যার পরিবর্তন, প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এবং শিক্ষার মান কতটা বিবেচনা করা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, করোনাভাইরাসের সময়েও মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল। ব্যানবেইসের তথ্যমতে, করোনা সংক্রমণ শুরুর আগের বছর ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৯ লাখ কমেছিল।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্যেও সার্বিকভাবে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকার চিত্র ফুটে উঠেছে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় শিক্ষার্থীর হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, স্বতন্ত্র কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী কমে ৬ লাখ ৫০ হাজারে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ৬ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি।
মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির চিত্র দেখা গেছে। ব্যানবেইসের তথ্য বলছে, দাখিল, আলিম, ফাজিল (পাস), ফাজিল (অনার্স) ও কামিল পড়ানো হয়—দেশে এমন মাদ্রাসা আছে ৯ হাজার ২৯৬টি। এসব প্রতিষ্ঠানে ২০২৫ সালে শিক্ষার্থী ছিল ২৮ লাখ ৪০ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালে ৯ হাজার ২৬৯টি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী ছিল ২৭ লাখ ৯৬ হাজারের বেশি। অর্থাৎ, এক বছরে মাদ্রাসার সংখ্যা বেড়েছে ২৭টি এবং শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪৩ হাজারের বেশি। তবে এই হিসাবে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা ও কওমি মাদ্রাসার তথ্য অন্তর্ভুক্ত নেই।
অন্যদিকে, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলের সংখ্যা বর্তমানে ১৪৩টি এবং এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ২৯ হাজার ৬৭২ জন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ২৯ হাজার ৭৭ জন। অর্থাৎ, এক বছরে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার্থী বেড়েছে ৫৯৫ জন।
মাধ্যমিকে এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণ এবং প্রতিবেদনের অন্যান্য পরিসংখ্যানের প্রবণতা বুঝতে নিবিড় গবেষণা প্রয়োজন। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে করোনার পর শিখন ঘাটতি, পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া, সাম্প্রতিক নানা বিষয়, শিশুশ্রমে যুক্ত হওয়া এবং শিক্ষাক্রমের প্রভাব থাকতে পারে বলে ধারণা করা যায়। তবে মাধ্যমিকে এত শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণসহ প্রতিবেদনের অন্যান্য পরিসংখ্যানের প্রবণতা বুঝতে নিবিড় গবেষণা প্রয়োজন। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।”