হাফ সিল্কের জামদানি শাড়ির ওপর পুঁতির সূক্ষ্ম কারুকাজ—এই নতুন শৈলীর শাড়ি এখন পরিচিত ‘কারদানা জামদানি’ নামে। টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পীদের তৈরি এই বিশেষ শাড়িটি এবারের দুর্গাপূজার বাজারে ক্রেতাদের প্রবল আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। শাড়িশিল্পীরা আশা করলেও ক্রেতাদের মধ্যে এমন ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হবে, তা আগে ধারণা করতে পারেননি তারা। ফলে বর্তমানে এই বিপুল চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পণ্য সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁতিরা।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীরা এই বিশেষ শাড়িটি সংগ্রহ করতে আগ্রহী হয়ে উঠলেও, কারুকাজের দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজনীয়তার কারণে চাহিদামতো সরবরাহ করতে পারছেন না উৎপাদকরা।
সাধারণত প্রতি বছর ঈদ এবং দুর্গাপূজার কথা মাথায় রেখে দেশজুড়ে টাঙ্গাইলের শাড়ির চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এই উৎসবগুলোকে কেন্দ্র করেই স্থানীয় তাঁতশিল্পীরা নতুন নতুন নকশার শাড়ি তৈরি করেন। চলতি বছরের কোরবানির ঈদে খুব সামান্য পরিমাণে ‘কারদানা জামদানি’ তৈরি করা হয়েছিল, তবে সে সময় এটি ক্রেতাদের তেমন দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই শাড়ির ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়, যার প্রভাব পড়েছে এবারের পূজার বাজারে। এখন ক্রেতারা বিশেষভাবে কারদানা জামদানির খোঁজ করছেন।
‘শাড়ির রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল এলাকায় শাড়ি উৎপাদন ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পূজার বাজার শুরু হতেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা টাঙ্গাইল থেকে নানা ধরনের শাড়ি নিয়ে যান। পণ্য সংগ্রহের পর বিভিন্ন এলাকা থেকে খবর আসতে থাকে যে, কারদানা জামদানির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ফলে তারা এই শাড়ি আরও বেশি পরিমাণে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
শাড়িশিল্পীদের বর্ণনা অনুযায়ী, একটি হাফ সিল্ক জামদানি শাড়ির ওপর ছোট ছোট পুঁতি বা দানার মতো অলংকরণ বসিয়ে এই কারদানা জামদানি শাড়ি তৈরি করা হয়।
টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এবং পাথরাইলের যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং–এর মালিক রঘুনাথ বসাক বলেন, “এবারের পূজার বাজারে কারদানা জামদানি বিক্রি করে টাঙ্গাইলের তাঁতিরা লাভবান হচ্ছেন। এ ছাড়া অন্য শাড়িরও চাহিদা রয়েছে।”
গত মঙ্গলবার পাথরাইল তাঁতপল্লিতে পরিদর্শনে দেখা যায়, শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় ব্যস্ত মানুষ। বিভিন্ন বাড়ি ও বিক্রয়কেন্দ্রে ভিড় জমেছে শাড়ি কিনতে। মির্জাপুর থেকে আসা ক্রেতা শেফালী সরকার বলেন, “টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি ছাড়া দুর্গাপূজার কথা চিন্তাই করা যায় না। তাই শাড়ি কিনতে পাথরাইলে চলে এসেছি। এবার সাধারণ শাড়ির পাশাপাশি কারদানা জামদানি বেশি ভালো লেগেছে। কিন্তু দামটা অনেক বেশি।”
পাথরাইলের প্রখ্যাত উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন—সীতানাথ-রঞ্জিত বস্ত্রালয়, যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং, বসাক বস্ত্রালয়, টাঙ্গাইল তাঁত কুটির এবং তারাপদ শাড়ি সবাই এই কারদানা জামদানি তৈরি করেছে।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যমতে, পুরো শাড়িতে কারদানা করা একটি জামদানির পাইকারি মূল্য মানভেদে সাড়ে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ১২ হাজার টাকা। অন্যদিকে, শুধুমাত্র আঁচল ও বডিতে কাজ করা শাড়ির পাইকারি দাম ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৬ হাজার টাকা। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বগুড়া এবং যশোরসহ যেসব এলাকায় এই শাড়ি পৌঁছেছে, সেখানেই এর ব্যাপক চাহিদার কথা জানা যাচ্ছে। একটি হাফ সিল্ক জামদানি শাড়িতে পুঁতি বসিয়ে কারদানা করতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগে, যার ফলে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়েছে।
শাড়ি ব্যবসায়ী সুবীর বসাক বলেন, “অনেক বছর পর এবার টাঙ্গাইলের একটি শাড়ির ব্যাপক চাহিদার সৃষ্টি হয়েছে। সেটি হচ্ছে কারদানা জামদানি। আমার প্রতিষ্ঠান থেকেই প্রায় ৮০০ কারদানা জামদানি সরবরাহ করেছি। তৈরি থাকলে আরও পাঁচ শতাধিক শাড়ি সরবরাহ করা যেত। কিন্তু সময়ের অভাবে চাহিদা থাকার পরও সরবরাহ করা যচ্ছে না।”
মাগুরার সাহা বস্ত্রালয়ের মালিক রেন্টু সাহা জানান, “কারদানা জামদানির অনেক চাহিদা রয়েছে পূজার বাজারে। কিন্তু আমাদের চাহিদামতো টাঙ্গাইলের উৎপাদকেরা সরবরাহ করতে পারছেন না।”
চট্টগ্রামের টেরী বাজারের শাড়ি ব্যবসায়ী শিপলু মিয়া মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে জানিয়েছেন, তাঁদের অঞ্চলেও এবার কারদানা জামদানির খুব চাহিদা রয়েছে।
অন্যান্য ব্যবসায়ীদের মতে, কারদানা জামদানির পাশাপাশি এবার পূজায় পাথরাইলে উৎপাদিত ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা মূল্যের হাফ সিল্ক শাড়ি, ১২ শ থেকে ৩ হাজার টাকা মূল্যের মাসলাইস কটন এবং ১৫ শ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকার টাঙ্গাইল জামদানি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করেছে। এছাড়া নতুন নকশার ঝুল বাঁধা সুতি শাড়িরও প্রচুর বিক্রি হচ্ছে।
টাঙ্গাইল চেম্বর অব কমার্সের পরিচালক বিশ্বজিৎ কুমার সাহা উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের শাড়ি জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এবারের পূজায় কারদানা জামদানির ভালো বাজার পাওয়াটা অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ।