মানুষের মনের গভীরে জমে থাকা ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হলো কথা। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মনের ভেতর কথাগুলো গুছিয়ে রাখা থাকলেও মুখে প্রকাশ করতে গিয়ে এক ধরণের জড়তা তৈরি হয়। এই সমস্যাটি অনেকের জন্যই বেশ প্রকট।

এমন পরিস্থিতিতে আল্লাহর সাহায্য চেয়ে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত নবী মুসার (আ.) দোয়াটি পাঠ করা যেতে পারে। এই দোয়ার মধ্যে রয়েছে মানসিক প্রশান্তি লাভ, কঠিন কাজ সহজ হওয়া, জিহ্বার জড়তা দূর হওয়া এবং নিজের বক্তব্য শ্রোতার কাছে বোধগম্য করার বিশেষ প্রার্থনা।

ঘটনার প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, আল্লাহ-তাআলা নবী মুসাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ফেরাউনের কাছে যেতে এবং তাকে আল্লাহর পথে আহ্বান করতে। তৎকালীন সময়ে ফেরাউন ছিল অত্যন্ত ক্ষমতাধর ও প্রতাপশালী শাসক। এমন একজন শাসকের সামনে সত্যের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব। এই কঠিন পরিস্থিতির মুখে মুসা (আ.) আল্লাহর কাছে নিজের কাজ সহজ করার এবং কথা বলার জড়তা দূর করার জন্য প্রার্থনা করেন। পবিত্র কোরআনে তাঁর সেই বিশেষ দোয়াটি বর্ণিত হয়েছে।

দোয়াটির উচ্চারণ হলো: ‘রাব্বিশরাহ লি সদরি। ওয়া ইয়াসসির লি আমরি। ওয়াহলুল উকদাতাম মিল লিসানি। ইয়াফকাহু কাওলি।’

এর অর্থ হলো: ‘হে আমার প্রতিপালক, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন। আমার কাজ সহজ করে দিন। আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ২৫–২৮)

মুসা (আ.)-এর এই প্রার্থনার গভীরে চারটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ফুটে উঠেছে:

১. সাহস ও প্রশান্তি কামনা: দোয়ার শুরুতেই মুসা (আ.) বলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন।’ বক্ষ প্রশস্ত করার অর্থ হলো অন্তরকে প্রশান্ত ও প্রশস্ত করা, যাতে কোনো কঠিন দায়িত্ব পালনের সময় মানসিক সংকীর্ণতা বা অস্থিরতা বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। অনেক মানুষ জনসম্মুখে কথা বলতে গিয়ে উদ্বেগ, ভয় এবং সংকোচের সম্মুখীন হন। এই প্রার্থনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানসিক দৃঢ়তা ও প্রশান্তির জন্য আল্লাহর সাহায্য চাওয়া অত্যন্ত জরুরি।

২. কাজের সহজতা প্রার্থনা: এরপর তিনি বলেন, ‘আমার কাজ সহজ করে দিন।’ মানুষের সামর্থ্য অত্যন্ত সীমিত, তাই আল্লাহর বিশেষ রহমত ও সাহায্য ছাড়া কোনো বড় দায়িত্ব যথাযথভাবে সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব। গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজের আগে আল্লাহর কাছে সহজতা কামনা করা মুমিনের জন্য একটি অনন্য শিক্ষা। বিশেষ করে বক্তব্য প্রদান, পাঠদান কিংবা কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নেওয়ার আগে এই প্রার্থনা করা যেতে পারে।

৩. জিহ্বার জড়তা দূর করার আবেদন: দোয়ার তৃতীয় অংশে মুসা (আ.) বলেন, ‘আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দিন।’ এখানে কথা বলার জড়তা কাটানোর আবেদনটি সরাসরি করা হয়েছে। অনেক সময় মানুষের মনে প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কথাগুলো সাবলীলভাবে প্রকাশ পায় না। এই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে স্পষ্ট ও সাবলীলভাবে কথা বলার সক্ষমতা চাওয়া হয়।

৪. বক্তব্যের বোধগম্যতা: দোয়ার শেষাংশে মুসা (আ.) বলেন, ‘যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।’ এর অর্থ হলো, কেবল কথা বলার সক্ষমতা অর্জনই যথেষ্ট নয়, বরং বক্তব্যটি এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে যেন শ্রোতা তা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন। বিশেষ করে একজন ধর্মপ্রচারকের জন্য এই শিক্ষাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দর কথা বলার সার্থকতা তখনই হয়, যখন বক্তব্যের মূল মর্ম শ্রোতার কাছে পরিষ্কার হয়।

মুসা (আ.)-এর এই দোয়ার পটভূমি বুঝতে সুরা শুআরার কয়েকটি আয়াত লক্ষ্য করা যায়। ফেরাউনের কাছে যাওয়ার নির্দেশ পাওয়ার পর তিনি নিজের কিছু সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, তাঁর বক্ষ সংকুচিত হয়ে আসে এবং জিহ্বা সাবলীলভাবে চলে না, যার ফলে তিনি আশঙ্কা করেন যে ফেরাউন হয়তো তাঁকে অস্বীকার করতে পারে। এই কারণেই তিনি তাঁর ভাই হারুনকে সহযোগী হিসেবে পাঠানোর আবেদন করেন। (সুরা শুআরা, আয়াত: ১৩)

মুসা (আ.) জানতেন যে তাঁর ভাই হারুন তাঁর চেয়ে অনেক বেশি বাকপটু ও সাবলীলভাষী। তাই তিনি আল্লাহর কাছে আবেদন করেন, ‘আর আমার ভাই হারুন, সে আমার চেয়ে বেশি সাবলীলভাষী। সুতরাং তাকে আমার সঙ্গে সাহায্যকারী হিসেবে পাঠান, সে আমাকে সমর্থন করবে।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ৩৪)

এই ঘটনা থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে, নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে উপযুক্ত ব্যক্তির সহযোগিতা চাওয়া কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি বিচক্ষণতার পরিচয়।

যারা কথা বলতে গিয়ে আটকে যান, বক্তব্যের আগে অস্বস্তি অনুভব করেন কিংবা জনসম্মুখে কথা বলার সময় সংকোচে ভোগেন, তারা এই দোয়াটি পড়তে পারেন। শিক্ষকতা, বক্তৃতা, পরীক্ষা, চাকরির সাক্ষাৎকার কিংবা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার আগেও আল্লাহর সাহায্য চেয়ে এই দোয়াটি পড়া অত্যন্ত ফলপ্রসূ।

তবে মনে রাখতে হবে, কথার জড়তা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় কিংবা দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরণের সমস্যা সৃষ্টি করে, তবে দোয়ার পাশাপাশি ধীরে ধীরে কথা বলার অনুশীলন করা, স্পষ্ট উচ্চারণের চর্চা করা এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ স্পিচ থেরাপিস্টের সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।

—নাহিদা সুলতানা: আলেমা ও প্রাবন্ধিক
[email protected]