জীবনের পরিস্থিতি সবসময় একরকম থাকে না। অনেক সময় আমরা এমন সব পরিস্থিতির মুখোমুখি হই, যার জন্য আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকি না। সেই মুহূর্তে ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রবল দুশ্চিন্তা তৈরি হয় এবং মনে প্রশ্ন জাগে, ‘আমার সঙ্গেই কেন এমন হয়?’
মুমিনের জীবনদর্শন সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা এবং ইতিবাচক। একজন মুমিন বিশ্বাস করেন যে, মানুষ পরিকল্পনা করে ঠিকই, তবে চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেন আল্লাহ। আর আল্লাহর পরিকল্পনা অত্যন্ত পূর্ণাঙ্গ, দূরদর্শী এবং কল্যাণময়। এই দৃঢ় আস্থা যদি অন্তরে গেঁথে নেওয়া যায়, তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তার প্রয়োজন থাকে না।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কোনো বিষয়কে অপছন্দ করো, অথচ তাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে; আবার কোনো বিষয়কে পছন্দ করো, অথচ তাতে তোমাদের জন্য অকল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৬)
আল্লাহর সিদ্ধান্তে আস্থা রাখা খুব কঠিন কোনো বিষয় নয়। নির্দিষ্ট পাঁচটি পদক্ষেপ অনুসরণ করলে খুব সহজেই এই বিশ্বাস অর্জন করা সম্ভব।
১. নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা
মানুষ সাধারণত বর্তমান পরিস্থিতি দেখে ভবিষ্যৎবাণী করে। আজকের একটি ব্যর্থতাকে সে জীবনের চূড়ান্ত ব্যর্থতা হিসেবে ধরে নেয়। অথচ সে জানে না যে, এই ব্যর্থতার আড়ালেই ভবিষ্যতের কোনো বড় কল্যাণ লুকিয়ে থাকতে পারে।
বিপদের সময়ে বারবার মনে করতে হবে যে, যে দরজাটি আজ বন্ধ হয়ে গেছে, সেটি হয়তো আপনার জন্য কল্যাণকর ছিল না। যে সুযোগটি আপনি হারিয়েছেন, তা হয়তো ভবিষ্যতে বড় কোনো ক্ষতির কারণ হতে পারত। কোরআনের এক আয়াতে এই বাস্তবতাকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, ‘আল্লাহ জানেন, আর তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৬)
বর্তমান মুহূর্তকে অতীতের ‘যদি’র কাছে বন্দী করে ফেলা অনুচিত। ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি, তবে অনুশোচনার জালে আটকে পড়া ঠিক নয়।
২. যথাযথ দায়িত্ব পালন করা
চেষ্টা করা মানুষের দায়িত্ব, আর ফলাফল নির্ধারণ করা আল্লাহর হাতে। আপনি যদি চাকরি পেতে চান, তবে আবেদন করুন, প্রস্তুতি নিন এবং নিজের দক্ষতা বৃদ্ধি করুন। পরীক্ষায় ভালো ফল করতে হলে পড়াশোনা করুন। ব্যবসার ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা করুন এবং সম্পর্কের ক্ষেত্রে আন্তরিকতা দেখান।
মূল কথা হলো, নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা। সর্বোচ্চ চেষ্টার পর ফলাফল আশানুরূপ না হলেও মনে রাখতে হবে, আপনার দায়িত্ব ছিল চেষ্টা করা এবং আপনি তা করেছেন। ফলাফল নির্ধারণ করা আপনার এখতিয়ারে নেই।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তিকে তার উট ছেড়ে দিয়ে বলেছিল, ‘আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করেছি।’ তখন নবীজি (সা.) তাকে বলেছিলেন, ‘আগে উটটি বেঁধে নাও, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৭)
৩. ‘যদি’ বলার অভ্যাস ত্যাগ করা
অতীতের কোনো কাজ বা সিদ্ধান্ত নিয়ে অতিরিক্ত অনুশোচনা করা থেকে বিরত থাকা উচিত। এই মানসিকতা অনেক সময় মানুষকে আল্লাহর ওপর আস্থা হারাতে বাধ্য করে।
অনেকে বলে থাকেন—
‘যদি সেদিন এটা করতাম’
‘যদি ওই চাকরিটা নিতাম’
‘যদি তখন তাকে বিশ্বাস না করতাম’
এভাবে বর্তমানকে অতীতের ‘যদি’র কাছে বন্দী করে ফেলাটা অনুচিত। ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে, কিন্তু অনুশোচনায় আটকে গেলে চলবে না।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বলের তুলনায় আল্লাহর কাছে উত্তম ও অধিক প্রিয়। প্রত্যেকের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। যাতে তোমার উপকার তার প্রতি আগ্রহী হও, আল্লাহর সাহায্য চাও এবং অক্ষম হয়ে বসে থেকো না। আর যখন কোনো বিপদ আপতিত তখন এভাবে বলো না, ‘যদি আমি এমন করতাম’ তাহলে এমন এমন হত।বরং এভাবে বলেবে, ‘আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন এবং তিনি যা চেয়েছেন, তাই হয়েছে।’ কারণ ‘যদি’ শব্দটি শয়তানের পথ খুলে দেয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪)
মুমিনের উচিত আল্লাহ সম্পর্কে সদয় ও ইতিবাচক ধারণা রাখা। কারণ আল্লাহ-তাআলা কখনও তাঁর বান্দাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেন না।
৪. আল্লাহর প্রতি সু-ধারণা পোষণ করা
বিপদের সময় অনেক সময় মনে হয়, ‘আল্লাহ হয়তো আমাকে ছেড়ে দিয়েছেন।’ এই ধারণা অত্যন্ত বিপজ্জনক। মুমিনের উচিত সর্বদা আল্লাহ সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখা।
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, ‘আমি সেরূপই, যেরূপ বান্দা আমার প্রতি ধারণা রাখে। আমি তার সাথে থাকি যখন সে আমাকে স্মরণ করে। যদি সে মনে মনে আমাকে স্মরণ করে, আমিও তাকে নিজে স্মরণ করি। আর যদি সে লোক-সমাবেশে আমাকে স্মরণ করে, তবে আমিও তাদের চেয়ে উত্তম সমাবেশে তাকে স্মরণ করি। যদি সে আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয়, তবে আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই, যদি সে আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয়; আমি তার দিকে দু হাত অগ্রসর হই। আর সে যদি আমার দিকে হেঁটে অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দৌড়ে অগ্রসর হই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৫০৫)
তাই সংকটের সময়ে মনে মনে বলুন, আমার পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর সিদ্ধান্ত কখনও ভুল হতে পারে না। এই বিশ্বাস মনের অস্থিরতা কমিয়ে দেয় এবং আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা সহজ করে তোলে।
৫. আন্তরিক দোয়া অব্যাহত রাখা
মুমিনের জন্য দোয়া হলো সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। দোয়ার মাধ্যমে বান্দা নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে অসীম ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে।
দোয়ার পর কোনো কিছু না পাওয়া মানেই এই নয় যে আল্লাহ তা কবুল করেননি। কখনো তিনি চাওয়া জিনিসটি দেন, কখনো তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করেন, আবার কখনো কোনো অদৃশ্য বিপদ থেকে রক্ষা করেন। এই বিশ্বাসের কারণেই আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর যখন তুমি কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ওপর ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)
আল্লাহর সিদ্ধান্তে আস্থা রাখা একজন মুমিনের জন্য পরম আনন্দের বিষয়। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখে, সে ব্যর্থতায় ভেঙে পড়ে না, দীর্ঘ অপেক্ষায় হতাশ হয় না এবং কোনো কিছু হারালেও আল্লাহর প্রতি অভিযোগ করে না।
কারণ সে জানে, তার জন্য কোনটি কল্যাণকর তা তার চেয়ে ভালো আল্লাহই জানেন। এই বিশ্বাসের নামই হলো তাওয়াক্কুল, আর এখানেই মুমিনের প্রকৃত প্রশান্তির রহস্য নিহিত।
— মাহমুদ হাসান ফাহিম: আলেম ও লেখক