‘অসাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রনাথকে মুছে ফেলা যাবে না’—এই বিশেষ শিরোনামে জাতীয় কবিতা পরিষদের ৭২তম কবিতাপাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার বিকেলে রাজধানীর ইস্কাটনের কাজল মিলনায়তনে এই আয়োজনের পরিবেশ তৈরি করা হয়। অনুষ্ঠানে কবি, লেখক, সাংবাদিক এবং কবিতাপ্রেমীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়। সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পুরো আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান।
অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে কবি মোহন রায়হান বর্তমান পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নানা নিদর্শন মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। এর অংশ হিসেবে আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিদেরও আঘাত করা হচ্ছে। কয়েক দিন আগে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি লাগানোর ঘটনাও এর উদাহরণ। এ ধরনের ঘটনা সমাজে বিভেদ ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরির ঝুঁকি বাড়ায়। এসবের প্রতিবাদ জানাতেই এবারের আয়োজনের এমন শিরোনাম দেওয়া হয়েছে।’
প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত কবি মতিন বৈরাগী ইতিহাসের প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান সমাজবাস্তবতার আলোকে রবীন্দ্রনাথের সৃজনশীল কর্মের অপরিহার্যতা তুলে ধরেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ আমাদের সম্পদ। রবীন্দ্রনাথকে ছাড়া প্রাত্যহিক জীবন শুরু করা যায় না। আঘাত করে তাঁকে থামানো যাবে না। এগুলো করে আধিপত্যবাদীরা। এদের থামাতে হলে একটা সাংস্কৃতিক বিপ্লব লাগবে। রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে ধারণ করতে হবে।’
জাতীয় কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন রবীন্দ্রনাথের শক্তির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ এতটাই শক্তিশালী যে তাঁকে যত আঘাত করা হবে, ধ্বংস করার চেষ্টা করা হবে, তিনি ততই নতুন করে সৃষ্টি হবেন। আমাদের বাংলা ভাষার সৌকর্য, ব্যাকরণগত দিক ও বিজ্ঞানমনস্কতা রবীন্দ্রনাথেরই তৈরি। এখানে যে অপ্রগতিশীল শক্তি রয়েছে, তারা রবীন্দ্রনাথকে মুছে দিতে চাইবে; কিন্তু তাদের সেই অপচেষ্টা পূরণ হবে না।’
কলকাতা থেকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আসা কবি মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায় বর্তমান সময়ে ধর্মের ভিত্তিতে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আজ রবীন্দ্রনাথকে সামনে রেখে ধর্মের ভিত্তিতে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে। অথচ তৎকালীন সমাজে মুসলমানদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের এবং রবীন্দ্রনাথের প্রতি মুসলমানদের যে সৌহার্দ্য ও সুসম্পর্ক ছিল, তা এক মাসেও বলে শেষ করা যাবে না। আরেকজনের কথা না বললেই নয়—কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তারা কাজী নজরুল ইসলামের মতো অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিকেও সাম্প্রদায়িক বানাতে চায়। আমরা তো তাঁদেরই সন্তান। এসব করে তাঁদের কালিমালিপ্ত করা যাবে না।’
কবি নাহিদ আহমেদের সঞ্চালনায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী আবদুল ওয়াদুদ।
অনুষ্ঠানের কবিতাপাঠ অংশে অংশ নেন কবি মতিন বৈরাগী, মোহন রায়হান, মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়, হরষিত বালা, রেজাউদ্দিন স্টালিন, গোলাম শফিক, শ্যামল জাকারিয়া, এ বি এম সোহেল রশিদ, ক্যামেলিয়া আহমেদ, রফিক হাসান, সাম্য শাহ, শাহীন চৌধুরী, নাহিদ হাসান এবং রাসেল আহম্মেদসহ আরও অনেকে।
আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আগামী ২৮ অক্টোবর বিকেল চারটায় জাতীয় কবিতা পরিষদের ৭৩তম কবিতাপাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।