সকাল পৌনে ১০টার দিকে। অন্যান্য দিনের মতোই কারখানায় ব্যস্ত ছিলেন শ্রমিকেরা। হঠাৎ শুরু হয় আর্তচিৎকার, চারদিকে ছোটাছুটি। মুহূর্তের মধ্যেই আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে পুরো কারখানায়। কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে চারদিক অন্ধকার হয়ে আসে। গাজীপুরের টঙ্গীর চেরাগআলী এলাকায় অবস্থিত ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ইউনিট-২-এ এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা থেকে জানা গেছে সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের কথা।
আজ বুধবার সকালে কারখানার ইউনিট-২-এ আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রায় চার ঘণ্টা ধরে ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী এবং বিজিবি সদস্যদের নিরলস চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এই অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
কারখানাটির চতুর্থ তলায় কর্মরত শ্রমিক রুমা আক্তার সেই মুহূর্তের আতঙ্ক বর্ণনা করে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘অন্যান্য দিনের মতো আজ সকালে কাজে যোগ দিই। হঠাৎ ধোঁয়া বের হতে দেখি। মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়া আমাদের ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় আমি ও অন্য শ্রমিকেরা দৌড়ে নিচে নেমে আসি। নিচে নামার সময় আমাদের এক সহকর্মী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে তাঁকেও উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসা হয়। বর্তমানে তিনি সুস্থ আছেন।’
আগুনের ধোঁয়ায় যখন চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছিল, তখন মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার আতঙ্ক অনুভব করেছিলেন শ্রমিক আফরোজা বেগম। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আগুনের ধোঁয়া যখন ছড়াইয়া পড়ল, মনে হইছিল আজকাই আমি শেষ, হয়তো বেঁচে ফিরতে পারমু না। চারদিকে সব অন্ধকার হইয়া গেছিল। আগুনের ধোঁয়ায় চোখ জ্বালাপোড়া করতেছিল। কেমনে যে বাইর হইলাম, আল্লাহই জানে।’
কারখানায় আগুন লাগার পর শ্রমিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যার যার অবস্থান থেকে দ্রুত নিচে নেমে আসার চেষ্টা করেন সবাই। ট্যাবলেট সেকশনের শ্রমিক মুসলিমা আক্তারও প্রায় একই অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমার পেছনে দুজন এবং আমার সামনে দুজন কাজ করছিল। হঠাৎ করেই পেছন থেকে একজন চিৎকার দিয়ে বলে যে আগুন। তখন আমরা চার–পাঁচজন বের হয়ে যাই। কারখানা থেকে বের হয়ে দেখি, দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে।’
ফায়ার সার্ভিস ও কারখানার শ্রমিকদের সূত্রে জানা গেছে, আগুন অত্যন্ত দ্রুত ভবনের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের তীব্র শিখা ও কালো ধোঁয়ায় আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। কারখানার ভেতরে থাকা বিপুল পরিমাণ ওষুধ, উৎপাদনসংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি এবং বিভিন্ন মালামাল আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের ১৪টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে আরও চারটি ইউনিট যোগ দেয়। শেষ পর্যন্ত গাজীপুর, টঙ্গী ও উত্তরাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার মোট ২১টি ইউনিট সম্মিলিতভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। বেলা একটার দিকে সেনাবাহিনী এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরাও এই অভিযানে যোগ দেন। বেলা দুইটার দিকে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসার বিষয়টি নিশ্চিত করেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ।
টঙ্গী ফায়ার সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা শাহিন আলম জানান, আগুনের ভয়াবহতা বিবেচনা করে বিভিন্ন স্টেশনের কর্মীরা সমন্বিতভাবে কাজ করেছেন। কারখানার ভবনটি ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও কাচ দিয়ে তৈরি হওয়ায় আগুন নেভানো বেশ কঠিন ছিল। ভবনের বিভিন্ন অংশ দ্রুত পুড়ে যাওয়ায় অগ্নিনির্বাপণ কর্মীদের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আগুনে কারখানার ওষুধ ও সরঞ্জামাদির ব্যাপক ক্ষতি হলেও তাৎক্ষণিকভাবে মোট ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। আগুনের সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে কারখানা কর্তৃপক্ষের ধারণা, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। অন্যদিকে, ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের ধারণা, কেমিক্যাল থেকে আগুন লাগার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই বিষয়ে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের কারখানায় প্রায় ২০০ শ্রমিক কাজ করেন। হঠাৎ চতুর্থ তলা থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখে শ্রমিকেরা চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন। পরে জরুরি অ্যালার্ম বাজানো হয়। এরপর কারখানার সব শ্রমিক দ্রুত ও নিরাপদে বের হয়ে আসতে সক্ষম হন। আমাদের কারখানায় কোনো দাহ্যপদার্থ নেই। প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে।’
তবে আগুনের প্রকৃত কারণ এখনো রহস্যজনক বলে জানান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ। তিনি বলেন, ‘কারখানার চারতলা ভবনের কেমিক্যাল থেকে আগুন লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রায় চার ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এখন ভেতরে থাকা আগুন ডাম্পিয়ের কাজ চলছে। এই কাজ আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) সারা দিন লাগবে। কর্তৃপক্ষের কাছে আমরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়েছি। তাদের পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা ছিল কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’