সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সম্প্রতি ‘ছিনতাইয়ের নতুন কৌশল ইলেকট্রিক শক’ শিরোনামে ১ মিনিট ১৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি কিছু গণমাধ্যমও তাদের অনলাইন পোর্টালে একই ধরনের শিরোনাম দিয়ে এই ভিডিওটি প্রচার করেছে। ভিডিওটির সাথে দাবি করা হচ্ছে যে, রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের নতুন কৌশল হিসেবে এখন ‘ইলেকট্রিক শক’ ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে ভিডিওটি যাচাই করে দেখা গেছে, এটি কোনো বাস্তব ঘটনার দৃশ্য নয় এবং এর সাথে বাংলাদেশের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রকৃতপক্ষে, ভারতের ‘The Ghumakkad’ নামক একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি সাজানো ভিডিওর খণ্ডিত অংশকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, ব্যস্ত রাস্তার পাশের ফুটপাতে পিঠে ব্যাগ নিয়ে এক যুবক কানে মোবাইল ফোন ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে এক ভবঘুরে ছেলে পেছন থেকে এসে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে। কিন্তু মোবাইল ফোনে কথা বলায় যুবকটি তাকে গুরুত্ব দেন না। এরপর সুযোগ বুঝে ছেলেটি যুবকের ঘাড়ে তরলজাতীয় কিছু ছিটিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর যুবকটি অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করেন এবং বারবার ঘাড়ে হাত দেন। অস্বস্তি যখন তীব্র হয়, তখন তিনি পাশের একটি মোটরসাইকেলের ওপর ব্যাগটি রেখে পেছনে কী ঘটেছে তা বোঝার চেষ্টা করেন। সেই সুযোগটি নিয়েই ছেলেটি যুবকের ব্যাগ এবং পকেটে থাকা মোবাইল ফোনটি নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।
প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত দেখা গেছে, ছিনতাইয়ের নতুন কৌশল ‘ইলেকট্রিক শক’ দাবি করে ভিডিওটি গণমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মসহ ফেসবুকে ৭০টিরও বেশি পেজ ও প্রোফাইল থেকে পোস্ট করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি গণমাধ্যমের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওটি ১ কোটি ৬০ লাখবার দেখা হয়েছে। ভিডিওটিতে প্রায় ২ লাখ প্রতিক্রিয়া এবং ৫৮ হাজার বার শেয়ার করা হয়েছে।
দাবিটির সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে অনলাইনে মূল ভিডিওটি খুঁজে পাওয়া যায়। ৩ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডের ওই মূল ভিডিওটির শিরোনামে লেখা ছিল, ‘টাকা চাইতে আসা ভবঘুরে ছেলেটি যুবকের সঙ্গে যা করেছে, তা দেখে নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারবেন না!’
ভিডিওর নিচে ইংরেজিতে একটি সতর্কবার্তা দেওয়া ছিল, যার অনুবাদ হলো, ‘এটি কোনো বাস্তব ঘটনা নয়। এটি শুধু বিনোদন ও সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে বানানো হয়েছে।’ এছাড়া ফেসবুক পেজে পোস্ট করা ভিডিওটির ট্যাগ করা শব্দগুলোর মধ্যেও ‘সচেতনতা’ শব্দটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা ছিল।
গত ৬ অক্টোবর ‘The Ghumakkad’ ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। পেজটির ঠিকানা হিসেবে ভারতের উত্তরপ্রদেশের কানপুরের নাম দেওয়া আছে। পেজটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, পথচারী ও যাত্রীরা জনপরিসরে বা ব্যস্ত সড়কে চুরি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন ধরনের বিপদের মুখে পড়তে পারেন—এমন বিষয় নিয়ে সচেতনতামূলক কনটেন্ট তৈরি করে এই পেজটি। সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তারা এ ধরনের আরও অনেক ভিডিও প্রকাশ করেছে।
‘The Ghumakkad’ নামের ভারতীয় পেজটির পরিচিতি অংশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘এই পেজের সব ভিডিওই চিত্রনাট্য অনুযায়ী তৈরি অথবা শুধু সচেতনতা বৃদ্ধি ও বিনোদনের উদ্দেশ্যে বানানো হয়েছে। দয়া করে এগুলোকে বাস্তব ঘটনা মনে করবেন না বা অতিরিক্ত গুরুত্ব দেবেন না।’
সুতরাং, ‘ইলেকট্রিক শক দিয়ে ছিনতাই’ দাবিতে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি একটি সাজানো ভিডিওর খণ্ডিত অংশ মাত্র। এটিকে বাস্তব ছিনতাইয়ের ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অসত্য।