এ বছর আগস্ট মাসের শেষ দিকে আমেরিকান দূতাবাসের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে দেশে যাওয়ার সময় বিমান বাংলাদেশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হয় লেখকের। তবে বাংলাদেশে যাত্রার পূর্বেই অনেক পরিচিত ব্যক্তি তাকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। বিশেষ করে, সম্প্রতি টরন্টো থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে ইতালির রোমে যাত্রাবিরতির আগে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে পরিচিতরা তাকে জানিয়েছিলেন যে, যান্ত্রিক ত্রুটি, মাঝ আকাশে নানা সমস্যা এবং নিম্নমানের যাত্রীসেবা যেন বিমান বাংলাদেশের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
পরিচিতদের এমন সতর্কবার্তায় মনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হলেও ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা এড়িয়ে বাংলাদেশে পৌঁছানোর জন্য বিমান বাংলাদেশই ছিল সবচেয়ে সুবিধাজনক বিকল্প। এছাড়া নিউইয়র্ক সিটির তুলনায় টরন্টো লেখকের বাড়ির অনেক কাছে হওয়ায় এই এয়ারলাইন্স বেছে নেওয়াটাই ছিল সবচেয়ে সাশ্রয়ী সিদ্ধান্ত।
তবে যাত্রার শুরুতেই বিমান বাংলাদেশের টরন্টো অফিসের ফোনভিত্তিক যাত্রীসেবার ধরন দেখে লেখক বেশ ধাক্কা খেয়েছেন। অতিরিক্ত একটি ব্যাগ নেওয়ার সুযোগ এবং তার সম্ভাব্য খরচ জানতে তিনি বিমানের টরন্টো অফিসে একাধিকবার ফোন করেন, কিন্তু কাউকে পাওয়া যায়নি। প্রতিবার ফোন করার পর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে কলটি স্টেশন ম্যানেজার এবং কান্ট্রি ম্যানেজারসহ বিভিন্ন পদের কর্মকর্তাদের কাছে স্থানান্তরিত করা হলেও শেষ পর্যন্ত কেউ ফোন রিসিভ করেননি। লেখক আক্ষেপ করে বলেন, "পদ আছে, লোক আছে কিন্তু যাত্রীসেবা দেওয়ার মতো কেউ নেই।" উল্লেখ্য, তিনি এই ফোনগুলো করেছিলেন দুপুরবেলায়, যা ছিল অফিসের ব্যস্ততম সময়।
ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে যারা অভিজ্ঞ, তারা জানেন যে কোনো প্রতিষ্ঠানের অনলাইন উপস্থিতি থাকলেও যদি তারা গ্রাহকদের বার্তার উত্তর না দেয়, তবে তার চেয়ে খারাপ গ্রাহকসেবা বা ব্যবসায়িক নীতি আর কিছু হতে পারে না। পরবর্তীতে টরন্টো বিমানবন্দরে বিমানের কাউন্টারে লাগেজের ওজন নিয়ে লেখক বড় ধরনের ঝামেলার সম্মুখীন হন। মাত্র এক পাউন্ড ওজন বেশি হওয়ার কারণে তার কাছে কয়েক শ ডলার অতিরিক্ত পরিশোধ করতে বলা হয়।
ফেরার পথে বাংলাদেশেও একই চিত্র দেখা গেছে। মাত্র এক পাউন্ড ওজন বেশি হওয়ার কারণে কানাডায় পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে ২০-২৫ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছিল। প্রায় দুই দশক ধরে আমেরিকায় বসবাস এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় লেখক অনেক নামী এয়ারলাইন্সের সেবা দেখেছেন। তবে তার মতে, "এ রকম জগাখিচুড়ি ধরনের যাত্রীসেবা এবং বিমানের কর্মকর্তাদের যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের প্রবণতা অন্য কোথাও দেখিনি।"
অবশ্যই সব দিক নেতিবাচক ছিল না। লেখকের মতে, বিমানের অভ্যন্তরীণ সেবা, কারিগরি পরিচালনা এবং নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে অন্য দেশের এয়ারলাইন্সগুলোর তুলনায় খুব বড় কোনো পার্থক্য তিনি লক্ষ্য করেননি। তবে তার মনে হয়েছে, বিমানের ভেতরে যাত্রীসেবার জন্য প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাব রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-টরন্টো ফ্লাইটে যাত্রীদের ধরন ও চাহিদার ভিন্নতার কারণে ইন-ফ্লাইট সেবার জন্য লোকবল বাড়ানো প্রয়োজন। অনেক যাত্রীই প্রথমবার বিমানে চড়েন এবং ২০ ঘণ্টা একটানা ভ্রমণের কষ্ট তাদের জন্য একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা।
যাত্রীদের মধ্যে অনেক বয়স্ক নারী-পুরুষ থাকেন যাদের শারীরিক সমস্যা রয়েছে এবং তারা বিমানের টয়লেট ব্যবহারে অভ্যস্ত নন। ফলে টয়লেট অপরিষ্কার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সময়মতো পরিষ্কার করার জন্য পর্যাপ্ত কর্মী না থাকলে অন্য যাত্রীদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এছাড়া খাবার পরিবেশন এবং যাত্রীদের ব্যক্তিগত চাহিদা অনুযায়ী সেবার জন্য আরও লোকবল প্রয়োজন। ঢাকা-টরন্টো ফ্লাইটে কেবিন ক্রুদের সঙ্গে কথা বলে লেখক জানতে পারেন যে, তারা এই বিষয়ে একমত এবং বিষয়টি উপলব্ধি করার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
সাধারণত বিভিন্ন এয়ারলাইনসে যাত্রী ও কেবিন ক্রুর অনুপাত ভিন্ন হয়। যেমন সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসে প্রতি ১৭ জন যাত্রীর জন্য একজন ক্রু থাকেন, আবার বাজেট এয়ারলাইনসে প্রতি ৫০ জনের জন্য একজন ক্রু থাকতে পারেন। বাংলাদেশে বেকার সমস্যা প্রকট। সরকারি কর্মকর্তাদের একাংশের দুর্নীতি ও অর্থ লুটপাটের কথা বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হয়েছে। তাই বিমান বাংলাদেশের ফ্লাইটে প্রয়োজন অনুযায়ী বেশি কেবিন ক্রু নিয়োগ করা হলে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে, তেমনি রেমিট্যান্স পাঠানো প্রবাসীদের কাছ থেকেও সরকার দোয়া পাবে বলে মনে করেন লেখক।
লেখকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিমানের ঢাকা-টরন্টো ফ্লাইটে কোনো আসনই খালি ছিল না, যাত্রী ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। নিউইয়র্ক রাজ্যের বাংলাদেশি-অধ্যুষিত শহর যেমন বাফেলো, আলবানি ও রচেস্টার থেকে টরন্টো মাত্র কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে হওয়ায় এসব শহরের বহু বাংলাদেশি এই রুটটি ব্যবহার করেন। বিমানের কেবিন ক্রুরা জানিয়েছেন, এই রুটের প্রায় ৮০ শতাংশ আয় আসে কার্গো পরিবহন থেকে। ইতালির রোমে যাত্রাবিরতির কারণে বাংলাদেশ থেকে প্রচুর তাজা পণ্য ইতালি ও কানাডায় পৌঁছাতে পারে, যা প্রবাসীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
বিমানের ঢাকা-টরন্টো রুটের মতো ঢাকা-নিউইয়র্ক রুটটিও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের কাছে জনপ্রিয় হতে পারে। যথাযথভাবে পরিচালনা করতে পারলে এই রুটটিও লাভজনক হয়ে উঠতে পারে। লেখকের মতে, "বিমানের ঢাকা-নিউইয়র্ক রুট হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী লাখ লাখ বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধার প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তাঁদের ন্যূনতম সেবা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস।"
দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানো এসব প্রবাসীর প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অচিরেই এই বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন লেখক।
মতামত লেখকের নিজস্ব। লেখক ড. দিলওয়ার আরিফ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ক্যানিসিয়াস ইউনিভার্সিটির মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও পরিচালক।