বগুড়ায় এক বিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষককে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখম করার অভিযোগ উঠেছে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রের বিরুদ্ধে। এই ঘটনার পর থেকে তার ছেলে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বাবা মো. বিপুল মিয়া। তিনি জানিয়েছেন, ছেলেকে খুঁজে পেলে শিক্ষকের পা ধরে ক্ষমা চাওয়ানোর তীব্র ইচ্ছা তার।
গত সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বিদ্যালয় ছুটির পর বাড়ি ফেরার পথে বগুড়া আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সামনে বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শারীরিক শিক্ষা বিষয়ের সহকারী শিক্ষক আবু রায়হানের ওপর এই হামলার ঘটনা ঘটে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ক্লাসে অতিরিক্ত দুষ্টুমি করার কারণে শিক্ষক আবু রায়হান ওই ছাত্রকে সতর্ক করেছিলেন। একই সঙ্গে তাকে তার অভিভাবককে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, এই সতর্কবার্তার জের ধরেই ওই ছাত্র শিক্ষকের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। লাঠির আঘাতে শিক্ষকের থুতনি মারাত্মকভাবে কেটে যায়, যেখানে আটটি সেলাই দিতে হয়েছে। এছাড়া তার ঘাড়েও গুরুতর আঘাত লেগেছে। ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র বিক্ষোভ সৃষ্টি হলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত ছাত্রকে বাধ্যতামূলক ছাড়পত্র (টিসি) প্রদান করে বহিষ্কার করেছে। পাশাপাশি এই ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
অভিযুক্ত ছাত্রের বাবা মো. বিপুল মিয়া পেশায় একজন ট্রাকচালক। তিনি জানান, অত্যন্ত কষ্ট করে দিন এনে দিন খান এবং ছেলেকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, “কখনো ছেলেকে ‘তুই’ করেও বলেন না। তারপরও ছেলে এমন ঘটনা ঘটাবে, তা তিনি ভাবতে পারেননি।”
বিপুল মিয়া আরও জানান, ঘটনার দিন মাগরিবের সময় দোকান থেকে টাকা নিয়ে ছেলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়, কিন্তু আর ফিরে আসেনি। আত্মীয়স্বজনের বাড়ি এবং সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ছেলেকে খুঁজে পেলে শিক্ষকের পা ধরে ক্ষমা চাওয়ানোর ইচ্ছা তার।
এদিকে বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে শিক্ষকের ওপর এই নজিরবিহীন হামলার প্রতিবাদে এবং দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। তারা শিক্ষকদের নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
প্রতিষ্ঠানটির ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. জিয়াউর রহমান বলেন, “২০০৬ সাল থেকে তারা এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। অনেক শিক্ষার্থী এখান থেকে পড়াশোনা শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক এ ঘটনা তাদের দীর্ঘদিনের অর্জনকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।” তিনি সন্তানদের মোবাইল ফোন ব্যবহার এবং নিয়মিত ক্লাসে যাওয়া-আসার বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
বাংলা বিষয়ের সহকারী শিক্ষক হোসনে মুবিনা নীলা বলেন, “তারা শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসেন। প্রতিষ্ঠানের ২০ বছরের ইতিহাসে এমন ঘটনা ঘটেনি। সামান্য বিষয়ে সতর্ক করায় একজন শিক্ষকের ওপর হামলার ঘটনা দুঃখজনক। একজন শিক্ষকের ওপর আঘাত মানে পুরো শিক্ষক সমাজের ওপর আঘাত।”
প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, অভিভাবকদের উচিত তাদের সন্তানদের চলাফেরা ও আচরণের বিষয়ে বিশেষ খেয়াল রাখা। তিনি নিশ্চিত করেন যে, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে টিসি দেওয়া হয়েছে এবং থানায় অভিযোগ করা হয়েছে।
এই বিষয়ে বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহীম আলী জানান, শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় থানায় অভিযোগ করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।