রাজবাড়ী জেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে বালিয়াকান্দি উপজেলার জঙ্গল ইউনিয়নে অবস্থিত বন্যাতৈল গ্রাম। এই গ্রামেরই প্রয়াত গোপাল চৌধুরীর পরিবারটি বর্তমানে চরম অভাব-অনটন আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করছে। বন্যাতৈল বাজারের পাশে অবস্থিত তাঁদের বসতবাড়িতে রয়েছে একটি পুরোনো জরাজীর্ণ টিনের ঘর, যা এখন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এর পাশেই সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া একটি আধা পাকা ঘর রয়েছে, যেখানে পরিবারের ১১ জন সদস্য গাদাগাদি করে বসবাস করেন। এই পরিবারের ৫ জনই প্রতিবন্ধী এবং আরও একজন সদস্য জটিল চর্মরোগে আক্রান্ত।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২৫ বছর আগে গোপাল চৌধুরী মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর দুই বছর পর পরলোকগমন করেন তাঁর স্ত্রী সরস্বতী চৌধুরী। তাঁদের বড় ছেলে কাশিনাথ চৌধুরী (৬৫) দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে সুহাগী চৌধুরী (৬২) শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং ছোট মেয়ে দ্রৌপদী চৌধুরী (৫৮) বাক্প্রতিবন্ধী।
গোপাল চৌধুরী মৃত্যুর আগে ছোট মেয়ে দ্রৌপদীকে একই ইউনিয়নের বুদ্ধিশ্বর মণ্ডলের (৬৫) সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন। বুদ্ধিশ্বর নিজেও জটিল চর্মরোগে ভুগছেন। এই দম্পতির ২৬ বছর বয়সী মেয়ে উত্তরা মণ্ডলও (২৮) শারীরিক প্রতিবন্ধী। অন্যদিকে, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কাশিনাথ চৌধুরীর স্ত্রী সাধনা চৌধুরীও (৬০) অনেকটা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতার শিকার। তাঁদের দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে এবং সন্তানদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে।
গত রোববার (১১ অক্টোবর) দুপুরে গোপাল চৌধুরীর বাড়িতে দেখা যায়, জরাজীর্ণ টিনের ছাপরা ঘরের ভেতর মাটিতে বসে ভাত খাচ্ছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কাশিনাথ চৌধুরী। তাঁর স্ত্রী সাধনা চৌধুরী নাতনিকে কোলে নিয়ে ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে মাঝেমধ্যে খোঁজ নিচ্ছিলেন যে তাঁর কিছু লাগবে কি না।
জরাজীর্ণ টিনের ঘরের বারান্দায় কিছু পেঁয়াজ ছড়ানো ছিল। পাশেই আধা পাকা ঘরটিতে বারান্দায় বসে ভাত খাচ্ছিলেন বুদ্ধিশ্বর মণ্ডল। সাংবাদিকের আগমনের কথা জানতে পেরে তিনি দ্রুত খাওয়া শেষ করে সামনে এগিয়ে আসেন। আলাপচারিতার ফাঁকে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন দুই পা বিকলাঙ্গ উত্তরা মণ্ডল। হামাগুড়ি দিয়ে সামনে এলেন বাড়ির বড় মেয়ে সুহাগী চৌধুরীও।
বাড়িতে বসে তাঁদের সাথে কথা বলে জানা যায় জীবনযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতার কথা। পরিবারের সদস্যদের দেখাশোনা এবং সংসারের যাবতীয় খরচ মূলত বহন করেন বুদ্ধিশ্বর মণ্ডল এবং কাশিনাথের ছেলে বিশ্বজিৎ চৌধুরী। বিশ্বজিতের স্ত্রী রিতু চৌধুরী। বিশ্বজিৎ পেশায় একজন দিনমজুর। অন্যদিকে, বুদ্ধিশ্বর স্থানীয় বাজারে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করে যে সামান্য পারিশ্রমিক পান, তা দিয়েই এই বিশাল সংসার চালানোর চেষ্টা করেন তিনি।
বুদ্ধিশ্বর মণ্ডল বলেন, “প্রায় ৩০ বছর ধরে আমি এই পরিবারে আছি। আমার শ্বশুর গোপাল চৌধুরী বাজারে পান বিক্রি করতেন। সামান্য আয় দিয়ে কোনোভাবে সংসার চলত। শ্বশুরের মৃত্যুর পর সংসারের পুরো দায়িত্ব আমার কাঁধে পড়ে। কিন্তু আমিও শারীরিকভাবে সুস্থ নই। তারপরও সপ্তাহে তিন দিন বাজার পরিচ্ছন্নতার কাজ করি। দোকানিদের কাছ থেকে দিনে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পাই। স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতাও নেই। এভাবেই এত বড় সংসার সামলাচ্ছি আমি।”
বুদ্ধিশ্বর আরও জানান, স্ত্রীর বড় ভাই ও বোনের দেখভাল, তাঁদের সন্তানদের বিয়ে, পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা, খাবার ও পোশাকের যাবতীয় খরচ তাঁকে বহন করতে হয়। তাঁর নিজের মেয়ে জন্মের সময় সুস্থ থাকলেও তিন বছর বয়সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। অর্থের অভাবে সঠিক চিকিৎসা করাতে না পারায় মেয়েটির দুই পা বিকলাঙ্গ হয়ে যায়।
বুদ্ধিশ্বরের স্ত্রী দ্রৌপদী চৌধুরী বাক্প্রতিবন্ধী এবং মাঝেমধ্যে তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে হারিয়ে যান। দ্রৌপদীর বড় বোন সুহাগী চৌধুরী জন্মগতভাবেই দুই পা বিকলাঙ্গ। তাঁর খাওয়া-দাওয়া এবং শৌচাগার ব্যবহারের মতো দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজেও অন্যের সহায়তার প্রয়োজন হয়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কাশিনাথকে দেখভালের জন্য বিয়ে দেওয়া হলেও তাঁর স্ত্রী সাধনা চৌধুরীও অনেকটা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী।
বুদ্ধিশ্বর বলেন, “শ্বশুরের রেখে যাওয়া টিনের ঘরটি এতটাই জরাজীর্ণ যে সেখানে থাকা যায় না। মাঝেমধ্যে স্ত্রীর বড় ভাই ও তাঁর স্ত্রী সেখানে থাকেন। কয়েক বছর আগে সরকারিভাবে একটি আধা পাকা ঘর পেয়েছি। কিন্তু পরিবারের সদস্য বেশি হওয়ায় ওই একটি ঘরে সবাইকে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। এত বড় সংসারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে আমি এখন হাঁপিয়ে উঠেছি। পরিবারের জন্য আরেকটি ঘর ও আয়ের স্থায়ী ব্যবস্থা হলে তাঁদের কষ্ট কিছুটা কমত।”
স্থানীয় বাসিন্দা শিবনাথ বসু জানান, গোপাল চৌধুরীর তিন ছেলে-মেয়ের সবাই প্রতিবন্ধী। জামাতা বুদ্ধিশ্বর মণ্ডলও শারীরিক জটিলতা নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন। তিনিই পরিবারের সবার দেখাশোনা করেন। বাজারের পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করে যে দুই-চার শ টাকা পান, তা দিয়ে এত বড় সংসার চালানো অত্যন্ত কঠিন।
বালিয়াকান্দি উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মো. ওয়াসিম আকরাম মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ইতিমধ্যে ওই পরিবার থেকে প্রয়াত গোপাল চৌধুরীর তিন ছেলে–মেয়ে প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। নতুন করে জামাতা বুদ্ধিশ্বর মণ্ডল ও তাঁর মেয়ে উত্তরা মণ্ডলের নামও দেওয়া হয়েছে। আশা করি, তাঁরা এ বছরের শেষ দিকে পাবেন। প্রত্যেকে ছয় মাস অন্তর ছয় হাজার টাকা করে পাবেন।” সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে যদি আরও কিছু করা যায়, সেই চেষ্টাও করা হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
পরিবারটি চরম কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে জানিয়ে বালিয়াকান্দি উপজেলার ৬ নম্বর জঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কল্লোল কুমার বসু বলেন, “পরিবারটির জন্য আরেকটি ঘর ও আয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।” তিনি সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের এই অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।