একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর আত্মগোপনে থাকার পর অবশেষে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন নজরুল ইসলাম। পুলিশের একাধিক অভিযানকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সদস্যদের জালে ধরা পড়লেন তিনি।
গ্রেপ্তারকৃত নজরুল ইসলাম (৪৮) রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার জঙ্গল ইউনিয়নের ঢোলজানি গ্রামের বাসিন্দা। ওই গ্রামেরই কিশোর ওমর আলী হত্যা মামলার প্রধান আসামি তিনি।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি, যখন আহেদ শেখের ১৪ বছর বয়সী ছেলে ওমর আলী নিখোঁজ হয়। নিখোঁজের তিন দিন পর, ৪ জানুয়ারি গ্রামের একটি ঘাসখেত থেকে পুলিশ ওমরের লাশ উদ্ধার করে। এই হত্যাকাণ্ডের পর নিহতের বাবা অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। শুরুতে বালিয়াকান্দি থানা পুলিশ মামলাটি তদন্ত করলেও ওই বছরের মে মাস থেকে তদন্তের দায়িত্ব গ্রহণ করে পিবিআইয়ের ফরিদপুর কার্যালয়।
হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই নজরুলের গতিবিধি রহস্যময় হয়ে ওঠে এবং তিনি আত্মগোপনে চলে যান। গত সোমবার সাভারের আশুলিয়া এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর গতকাল মঙ্গলবার রাজবাড়ীর আদালতে জবানবন্দি দিয়ে তিনি এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছেন।
মামলাটি যেভাবে সমাধান হলো, তা নিয়ে পিবিআই ফরিদপুরের পরিদর্শক তাজুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ঘটনার পর থেকে নজরুল আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় তাঁকে আমাদের সন্দেহ হয়। তিনি ও তাঁর ছেলে বাড়িতে ছিলেন না। তবে তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে এলাকাতেই থাকতেন। নজরুল কোনো মুঠোফোন ব্যবহার করতেন না। তবে তাঁর মেয়ে চাচাতো ভাবির মুঠোফোন থেকে বাবার সঙ্গে কথা বলতেন। এ রকম সূত্র ধরে নজরুলের ছেলের মুঠোফোন নম্বরটি পাওয়া যায়। ৫ অক্টোবর (সোমবার) সন্ধ্যায় সাভারের আশুলিয়া থেকে নজরুলের ছেলেকে (২০) আটক করা হয়। পরে তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী রাত আটটার দিকে নজরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়।’
তদন্তকারী কর্মকর্তা আরও জানান, নজরুলকে ধরার জন্য পুলিশ অত্যন্ত চেষ্টা করেছিল। ২০২২ এবং ২০২৪ সালে ফরিদপুর ও শরীয়তপুরে মোট চারটি অভিযান চালানো হলেও প্রতিবারই তিনি কৌশলে পালিয়ে যান।
বুধবার বেলা ১১টার দিকে ফরিদপুর শহরের কমলাপুর এলাকায় পিবিআই কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে পিবিআই ফরিদপুরের পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম জানান, ওমর আলী হত্যার রহস্য এখন পুরোপুরি উদ্ঘাটন হয়েছে এবং গ্রেপ্তারকৃত নজরুল ইসলাম আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
আদালতের জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম বলেন, “পরকীয়া ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতাকে কেন্দ্র করে ওমর আলীকে ৫০ হাজার টাকার চুক্তিতে হত্যা করা হয়।” তদন্তে জানা গেছে, এই হত্যাকাণ্ডে নজরুলসহ মোট পাঁচজন জড়িত ছিলেন। ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১১টার দিকে হত্যাকারীরা ওমর আলীকে রাস্তা থেকে অপহরণ করে একটি বাড়ির বাথরুমে আটকে রেখে নির্যাতন করে। সেখানে তাঁর হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২ জানুয়ারি রাতে পুলিশের তল্লাশির কথা জানতে পেরে আততায়ী ওমরের গলা ছুরি দিয়ে কেটে হত্যা করেন এবং লাশটি গ্রামের ঘাসখেতে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যান।