বর্তমান সময়ে আমিষ বা প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর জন্য অনেকেই প্রোটিন শেক কিংবা প্রোটিন পাউডারের ওপর নির্ভর করছেন। বাজারে বিভিন্ন ধরনের প্রোটিন শেক পাওয়া যায়। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, সব ধরনের প্রোটিন শেক কি সবার জন্য উপযোগী? এটি কি প্রোটিনের প্রাকৃতিক বিকল্প হতে পারে, নাকি এর ব্যবহারে কোনো ঝুঁকি রয়েছে?

প্রোটিন শেক মূলত প্রোটিন পাউডার দিয়ে প্রস্তুত করা এক ধরনের পানীয়। এটি বাজারে তরল পানীয় হিসেবে যেমন পাওয়া যায়, তেমনি পাউডার হিসেবেও কেনা যায়। সাধারণত দুধ, ডিম কিংবা উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে এই শেক তৈরি করা হয়। প্রোটিন ছাড়াও এতে বিভিন্ন ভিটামিন, খনিজ উপাদান, চিনি কিংবা কৃত্রিম ফ্লেভার যুক্ত থাকতে পারে। গড়ে প্রতি পরিবেশনে বা পার সার্ভিংয়ে ১০ থেকে ৩০ গ্রাম প্রোটিন থাকে এই পানীয়তে।

একজন মানুষের প্রতিদিন ঠিক কতটা প্রোটিন প্রয়োজন, তা মূলত তাঁর শরীরের ওজনের ওপর নির্ভর করে। প্রাপ্তবয়স্ক একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে শরীরের প্রতি কেজি ওজনের জন্য প্রতিদিন শূন্য দশমিক ৮ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন। এই হিসেবে দেখা যায়, ৭০ কেজি ওজনের একজন মানুষের প্রতিদিন গড়ে ৫৬ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন হয়।

প্রাকৃতিক উৎস থেকেই এই চাহিদা খুব সহজেই পূরণ করা সম্ভব। যেমন, মুরগির একটি বড় আকারের ডিম থেকে আপনি ৬ গ্রাম প্রোটিন পেতে পারেন, তবে ডিমের আকার ছোট হলে প্রোটিনের পরিমাণ কিছুটা কম হবে। এছাড়া মাছ, মাংস, দুধ, সয়া, বিভিন্ন ধরনের ডাল এবং বীজজাতীয় খাবার যেমন কিনোয়া ও মিষ্টিকুমড়ার বীজ থেকেও প্রচুর প্রোটিন পাওয়া যায়। সুতরাং, প্রতিদিনের সুষম খাবার থেকেই প্রয়োজনীয় প্রোটিন পাওয়া সম্ভব। তাই আলাদা করে প্রোটিন শেক নেওয়ার প্রয়োজন সাধারণত পড়ে না এবং অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণ করাও উচিত নয়।

তবে যাদের দৈনন্দিন খাবারের মাধ্যমে প্রোটিনের চাহিদা পুরোপুরি পূরণ হয় না, কেবল তাদের জন্যই প্রোটিন শেক প্রয়োজনীয় হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, পুরোপুরি প্রোটিন শেকের ওপর নির্ভরশীল হওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে নিরামিষাশী ব্যক্তিরা প্রোটিন শেক গ্রহণ করতে পারেন। এছাড়া যাদের দুধ খেলে শারীরিক সমস্যা হয়, তাদের জন্যও প্রোটিন শেক একটি বিকল্প হতে পারে।

শারীরিক বিশেষ কিছু প্রয়োজনে প্রোটিনের চাহিদা বেড়ে যায়। যেমন, শরীরে বড় ধরনের আঘাত লাগলে বা বড় ধরনের ক্ষত হলে তা সারিয়ে তুলতে বাড়তি প্রোটিন প্রয়োজন হয়। একইভাবে অপারেশনের পরবর্তী সময়েও প্রোটিনের বাড়তি চাহিদা তৈরি হতে পারে।

খেলাধুলা ও শারীরিক পরিশ্রমের ক্ষেত্রে প্রোটিনের প্রয়োজনীয়তা ভিন্ন হয়। অ্যাথলেটিকস বা পরিশ্রমসাধ্য খেলাধুলায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের প্রতি কেজি ওজনের জন্য প্রতিদিন ১ দশমিক ১ থেকে ১ দশমিক ৪ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন। যারা প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে অংশ নেন, তাদের ক্ষেত্রে এই চাহিদা ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৪ গ্রামের মধ্যে থাকে। অন্যদিকে, আলট্রা-এন্ডুরেন্স বা অতিমাত্রার কঠিন অ্যাথলেটিকসের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের শরীরের প্রতি কেজি ওজনের জন্য প্রতিদিন ২ গ্রাম পর্যন্ত আমিষ প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়া যেসব ক্রীড়াবিদ পেশি গঠন বা মাসল বিল্ডিং করেন, তাদের প্রতি কেজি ওজনের জন্য প্রতিদিন ১ দশমিক ৫ থেকে ২ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন হয়।

বার্ধক্যে পেশির ঘনত্ব ধরে রাখার জন্য কিছুটা বাড়তি প্রোটিনের প্রয়োজন হয়, যা প্রতি কেজি ওজনের জন্য ১ দশমিক ৩৩ গ্রাম। তবে এক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট রোগের কারণে প্রোটিন গ্রহণে বিধিনিষেধ থাকলে তা অবশ্যই মেনে চলতে হবে। এছাড়া দুর্গম এলাকায় ভ্রমণের সময় যদি প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব না হয়, তবে প্রোটিন শেক সাথে রাখা যেতে পারে।

কৈশোরকাল হলো শারীরিক বৃদ্ধি এবং দৌড়ঝাঁপের সময়, তাই এই সময়ে প্রোটিনের চাহিদা বেশি থাকে। ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের প্রতি কেজি ওজনের জন্য শূন্য দশমিক ৮৮ থেকে ১ দশমিক ১১ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন। এই বয়সী অ্যাথলেটদের ক্ষেত্রে এই চাহিদা ১ দশমিক ১১ থেকে ১ দশমিক ৭৭ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। তবে চিকিৎসকদের মতে, এই বয়সে প্রোটিন শেক এড়িয়ে প্রতিদিনের স্বাভাবিক খাদ্যতালিকা থেকেই প্রোটিন গ্রহণ করা সবচেয়ে ভালো।

প্রোটিন শেক নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। কিছু শেক দুধ বা দুগ্ধজাত হুই (ঘোল) এবং কেসিন থেকে তৈরি হয়, যা দুধ অসহিষ্ণু ব্যক্তিদের এড়িয়ে চলা উচিত। আবার অনেকে ডিম, সয়া, চাল, মটর বা উদ্ভিজ্জ উপাদান থেকে তৈরি শেক বেছে নিতে পারেন। কেনার সময় প্রোটিনের মাত্রা এবং ক্যালরির দিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। চিনি বা কৃত্রিম উপকরণযুক্ত শেক যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত।

প্রোটিন শেকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে, যার ফলে ত্বক ফুলে যাওয়া বা ফুসকুড়ি হতে পারে। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স বা দুধ অসহিষ্ণুতা থাকলে হুই প্রোটিন শেক খাওয়ার পর পেটে অস্বস্তি, ব্যথা কিংবা ডায়রিয়া হতে পারে।

মনে রাখা প্রয়োজন, উৎস যাই হোক না কেন, অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণ ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে কিডনি রোগীদের জন্য বাড়তি প্রোটিন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া কিছু প্রোটিন শেকে সামান্য পরিমাণে ভারী ধাতু (হেভি মেটাল) পাওয়া গেছে। যদিও তা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর মাত্রায় নয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত পরিমাণে প্রোটিন শেক গ্রহণ করলে এসব উপাদানের বিষক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

ওয়েবএমডি অবলম্বনে