কলা এমন একটি ফল, যা সহজেই পাওয়া যায়, খেতেও সুবিধা এবং পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। সকালের নাশতা, বিকেলের হালকা খাবার অথবা ব্যায়ামের আগে বা পরে অনেকেই কলা খেতে পছন্দ করেন। কিন্তু প্রতিদিন একটি করে কলা খেলে শরীরে কী পরিবর্তন হতে পারে, তা কি জানেন?
কলায় আছে কার্বোহাইড্রেট, আঁশ, পটাশিয়াম ও ভিটামিন বি৬। এসব পুষ্টি উপাদান শরীরে শক্তি জোগানো, হজমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বজায় রাখা এবং পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় ভূমিকা রাখে। তবে শুধু কলা খেলেই সব পুষ্টির চাহিদা পূরণ হয়, এমন না। এর উপকার পেতে হলে সুষম খাবারের অংশ হিসেবে এই ফলটি খেতে হবে।
প্রতিদিন একটি করে কলা খেলে শরীরে কী পরিবর্তন হতে পারে, চলুন জেনে নিই।
শরীরে শক্তি জোগাতে সাহায্য করে: কলায় থাকা কার্বোহাইড্রেট শরীরের শক্তির অন্যতম উৎস। তাই সকালে নাশতার সঙ্গে কিংবা হাঁটাচলা ও ব্যায়ামের আগে কলা খেলে শরীর প্রয়োজনীয় শক্তি পেতে পারে।
বিশেষ করে ব্যস্ততার মধ্যে দ্রুত কিছু খেতে চাইলে কলা সুবিধাজনক একটি খাবার। তবে শুধু কলা খেলে সবার দীর্ঘ সময় পেট ভরা নাও থাকতে পারে। আরও দীর্ঘ সময় তৃপ্ত থাকতে চাইলে কলার সঙ্গে দই, বাদাম কিংবা অন্য কোনো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খেতে পারেন।
হজমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে: কলায় থাকা খাদ্যআঁশ বা ফাইবার অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে।
বিশেষ করে কিছুটা কাঁচা বা কম পাকা কলায় রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ থাকে। এটি অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবে কাজ করতে পারে। কলা পাকতে থাকলে এই স্টার্চের একটি অংশ শর্করায় পরিণত হয়।
তবে কলা খেলেই কোষ্ঠকাঠিন্য সেরে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। পর্যাপ্ত পানি পান করা, অন্যান্য ফল ও শাকসবজি খাওয়া এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমও হজমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে: কলায় থাকা পটাশিয়াম শরীরের তরল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রমের পাশাপাশি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে।
খাবারে পর্যাপ্ত পটাশিয়াম থাকা এবং একই সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ কম খাওয়া উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। তবে শুধু কলা খেলেই রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়ে যাবে, এমনটা ভাবা ঠিক নয়।
উচ্চ রক্তচাপ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়া, লবণ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন চালিয়ে যেতে হবে।
পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কাজে সাহায্য করে: পেশির সংকোচন, স্নায়ুর সংকেত আদান-প্রদান এবং শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য পটাশিয়াম গুরুত্বপূর্ণ। কলা এই খনিজের একটি খাদ্য উৎস।
শরীরে পটাশিয়ামের ঘাটতি হলে পেশিতে দুর্বলতা বা টান ধরার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে পেশিতে টান ধরলেই যে পটাশিয়ামের অভাব হয়েছে, তা নয়। পানিশূন্যতা, অতিরিক্ত পরিশ্রম, কিছু ওষুধ এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যার কারণেও এমন হতে পারে।
তাই পেশিতে বারবার টান ধরলে নিজে থেকে পটাশিয়ামের ওষুধ না খেয়ে কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ভিটামিন বি৬-এর চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখে: কলায় ভিটামিন বি৬ রয়েছে। এই ভিটামিন শরীরের বিপাকক্রিয়া, স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
নিয়মিত সুষম খাবারের অংশ হিসেবে কলা খেলে শরীর কিছু পরিমাণ ভিটামিন বি৬ পেতে পারে। তবে শুধু কলার ওপর নির্ভর না করে মাছ, মাংস, ডাল, শস্য ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারও খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত।
ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সাহায্য করতে পারে: কলায় থাকা আঁশ এবং এর স্বাভাবিক গঠন কিছু সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে। তাই চিপস, মিষ্টি বা অতিরিক্ত চিনি দেওয়া খাবারের বদলে কলা খাওয়া ভালো বিকল্প হতে পারে।
তবে কলা খেলেই ওজন কমবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ওজন বাড়া বা কমা নির্ভর করে সারাদিনে মোট কত ক্যালরি গ্রহণ করছেন, কতটা শারীরিক পরিশ্রম করছেন এবং আপনার সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস কেমন, তার ওপর।
ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে কলার পাশাপাশি পরিমিত খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম ও নিয়মিত ব্যায়ামের দিকে নজর দিতে হবে।
হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে: কলায় থাকা পটাশিয়াম, আঁশ এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে উপকারী। পর্যাপ্ত ফল ও শাকসবজি খাওয়া এবং অতিরিক্ত লবণ কমানোর মতো অভ্যাস হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক হতে পারে।
তবে কলা একা হৃদ্রোগ প্রতিরোধ করতে পারে না। হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ধূমপান এড়িয়ে চলা, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ এবং সুষম খাবার খাওয়া জরুরি।
প্রতিদিন কলা খেলে কি কোনো ক্ষতি হতে পারে?
বেশির ভাগ সুস্থ মানুষের জন্য প্রতিদিন পরিমিত পরিমাণে কলা খাওয়া নিরাপদ। তবে কিছু ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
কিডনির রোগ থাকলে
কিডনি শরীর থেকে অতিরিক্ত পটাশিয়াম বের করে দিতে সাহায্য করে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে রক্তে পটাশিয়াম বেড়ে যেতে পারে। কিছু ওষুধও এই ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এ অবস্থায় চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদ কলাসহ পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবারের পরিমাণ সীমিত করতে বলতে পারেন। তাই কিডনির রোগ থাকলে নিজের ইচ্ছামতো প্রতিদিন বেশি কলা খাওয়ার অভ্যাস শুরু করবেন না।
ডায়াবেটিস থাকলে
কলায় প্রাকৃতিক শর্করা ও কার্বোহাইড্রেট রয়েছে। তাই ডায়াবেটিস থাকলে কলার পরিমাণ এবং পাকার মাত্রার দিকে নজর রাখা দরকার। খুব পাকা কলায় শর্করা তুলনামূলক দ্রুত হজম হতে পারে।
তবে ডায়াবেটিস হলেই কলা পুরোপুরি বাদ দিতে হবে, এমন নয়। ব্যক্তির রক্তে শর্করার মাত্রা, খাবারের পরিকল্পনা এবং ওষুধের ওপর নির্ভর করে উপযুক্ত পরিমাণ নির্ধারণ করা যায়। প্রয়োজনে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।
অতিরিক্ত খেলে
প্রতিদিন অনেক বেশি কলা খেলে খাদ্যতালিকায় অন্য ফল, শাকসবজি ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের জায়গা কমে যেতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কলা খেলে পেট ফাঁপা বা হজমে অস্বস্তিও হতে পারে।
তাই প্রতিদিন কলা খাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ফল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
কলায় অ্যালার্জি থাকলে
কিছু মানুষের কলা খেলে চুলকানি, মুখ বা ঠোঁট ফুলে যাওয়া কিংবা অন্য ধরনের অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এমন হলে কলা খাওয়া বন্ধ করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। শ্বাস নিতে কষ্ট হলে বা গলা ফুলে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
প্রতিদিন কয়টি কলা খাওয়া ভালো?
সবার জন্য প্রতিদিন কতটি কলা খাওয়া উচিত, তার নির্দিষ্ট একক নিয়ম নেই। বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, মোট খাদ্যগ্রহণ এবং ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর প্রয়োজন নির্ভর করে।
সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতিদিন একটি মাঝারি আকারের কলা সাধারণত সুষম খাদ্যতালিকায় রাখা যায়। তবে এটি বাধ্যতামূলক কোনো সংখ্যা নয়। অন্য ফল খেলে বা খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় পুষ্টি অন্য উৎস থেকে পেলে প্রতিদিন কলা খেতেই হবে, এমন নয়।
কলা সকালের নাশতায়, খাবারের মাঝখানে কিংবা ব্যায়ামের আগে বা পরে খেতে পারেন। খালি পেটে কলা খেলেই ক্ষতি হবে, এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। কোন সময়ে খেলে সবচেয়ে বেশি উপকার হবে, তা মূলত আপনার খাদ্যাভ্যাস ও ব্যক্তিগত সহনশীলতার ওপর নির্ভর করে।
প্রতিদিন কলা খাওয়া বেশির ভাগ সুস্থ মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। এটি শরীরে শক্তি জোগায়, আঁশ ও পটাশিয়াম সরবরাহ করে এবং পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে।
তবে কলাকে কোনো রোগের চিকিৎসা কিংবা সব পুষ্টির একমাত্র উৎস হিসেবে দেখা উচিত নয়। কিডনির রোগ, ডায়াবেটিস বা কলায় অ্যালার্জি থাকলে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত অবস্থা অনুযায়ী পরিমাণ ঠিক করুন। সবচেয়ে ভালো ফল পেতে কলার পাশাপাশি বিভিন্ন ফল, শাকসবজি, শস্য ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার মিলিয়ে সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন।
সূত্র: ভারতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টিভি ৯ বাংলা-তে ‘প্রতিদিন একটি কলা খেলে শরীরে কী কী পরিবর্তন হয়?’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।