কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা মানুষের চমৎকার এক অনুভূতি। অপরের দেওয়া উপহার, ভালোবাসা কিংবা সহযোগিতার মূল্য হৃদয় থেকে স্বীকার করার নামই হলো কৃতজ্ঞতা।

মানুষের সম্পর্ক যত জটিল হচ্ছে, কৃতজ্ঞতা জানানোর চর্চা যেন ততই হারিয়ে যাচ্ছে। অনেকে এখন প্রায়ই স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রশ্ন করে বসে, ‘কৃতজ্ঞতা জানানোর কী দরকার?’ কিংবা ‘ধন্যবাদ দেওয়ার মতো কী এমন ঘটেছে?’

বিশেষ করে নিজেদের নিকটাত্মীয় ও পারিবারিক সম্পর্কের ভেতরেই এই উদাসীনতা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে।

প্রতিদিনের চেনা গণ্ডিতে একে অপরের অবদানকে আমরা খুব সহজেই ‘স্বাভাবিক দায়িত্ব’ হিসেবে ধরে নিই। স্ত্রীর হাজারো যত্নকে মনে করা হয় ‘এটা তো তাঁর সংসারের কাজ’, কিংবা ভাইয়ের কোনো উপকারকে উড়িয়ে দেওয়া হয় ‘ভাই হিসেবে এটাতো তাঁর করাই উচিত’ বলে।

সামাজিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, পরিবারে ও সমাজে প্রশংসার অভাব মানুষের সম্পর্ককে দ্রুত শিথিল করে দেয়। (আলি আল-হাশিমি, আল-মুজতামাউল ইসলামি, ১/৭৮, দারুল বাশাইর, কায়রো, ২০০২)

যে সম্পর্কের ভিত্তি একসময় ভালোবাসা দিয়ে তৈরি হয়েছিল, সেখানে অকৃতজ্ঞতার কারণে বাসা বাঁধে তিক্ততা।

অন্তরের কৃপণতা

মানুষের পক্ষে সহজে কৃতজ্ঞ হতে না পারার মূল কারণটি লুকিয়ে রয়েছে তার নিজের অন্তরের গঠনের ভেতরে। ইসলামি জীবনদর্শন অনুযায়ী, মানুষের নফসের (আত্মা) ভেতরে কিছুটা কৃপণতা ও স্বার্থপরতার প্রবণতা থাকে। মানুষ নিজের কাছে সম্পদ জমিয়ে রাখতে ভালোবাসে, তা অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া কিংবা অন্যের ত্যাগের স্বীকৃতি দেওয়া তার জন্য কিছুটা কঠিন।

আল্লাহ অন্তরের এই কৃপণতা জয় করাকেই সফলতার চাবিকাঠি হিসেবে ঘোষণা করেছেন, আর যাদের অন্তরের কৃপণতা থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই মূলত সফলকাম। (সুরা হাশর, আয়াত: ৯)

আত্মাকে কৃপণতা থেকে মুক্ত করে উদার হিসেবে গড়ে তোলা এক বড় নৈতিক সংগ্রাম। আত্মশুদ্ধি সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছে, শপথ আত্মার এবং যিনি তাকে সুবিন্যস্ত করেছেন; অতঃপর তাকে তার অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন। অবশ্যই সে সফলকাম হয়েছে, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে। (সুরা শামস, আয়াত: ৭-৯)

অন্তরের কৃপণতা ও অহংকার মুছে না গেলে মানুষ কখনো খাঁটি কৃতজ্ঞ হতে পারে না; তাকওয়া মানুষকে অন্যের উপকারের স্বীকৃতি দিতে শেখায় এবং তার ভেতরের অহংবোধ চূর্ণ করে দেয়।

অন্য এক আয়াতে মানুষের আত্মার সাধারণ স্বভাব তুলে ধরে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই মানবআত্মা মন্দ কাজের নির্দেশ দেয়, তবে আমার প্রতিপালক যার ওপর দয়া করেন সে ছাড়া। (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৩)

মানুষ সাধারণত নিজের অর্জন ও সম্পত্তিকে অন্যদের চেয়ে বেশি ভালোবাসে। একবার মহানবী (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি, যে নিজের সম্পদের চেয়ে উত্তরাধিকারীর সম্পদকে বেশি ভালোবাসে?’ সাহাবিরা উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আল্লাহর রাসুল, আমাদের প্রত্যেকেই তো নিজের সম্পদকেই বেশি ভালোবাসে।’

তখন মহানবী (সা.) বুঝিয়ে দিলেন যে মানুষ দান-সদকা বা অন্যের কল্যাণে যা খরচ করে সেটাই তার নিজের আসল সম্পদ, আর যা সে জমিয়ে রেখে যায় তা তার উত্তরাধিকারীদের। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৪২)

সুতরাং, যখন কোনো মানুষ আমাদের উপকার করে, আমাদের বোঝা উচিত যে কাজটি তার জন্য সহজ ছিল না। সে তার নিজের স্বভাবজাত কৃপণতাকে জয় করে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে। এই মানসিক ত্যাগকে সম্মান জানাতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সুস্থ চিন্তার পরিচয় দেয়।

তাকওয়া ও কৃতজ্ঞতার মেলবন্ধন

প্রকৃত ধার্মিকতার (তাকওয়া) সঙ্গে কৃতজ্ঞতার সম্পর্ক নিবিড়। একজন খোদাভীরু মানুষ সবসময় মানুষের অবদানের কথা মনে রাখে। কারণ সে জানে যে, সৃষ্টির প্রতি কৃতজ্ঞ হতে না পারলে সৃষ্টিকর্তার প্রতিও কৃতজ্ঞ হওয়া যায় না।

মহান আল্লাহ বারবার তাকওয়ার চর্চার পাশাপাশি কৃতজ্ঞ হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন, অতএব তোমরা আল্লাহভীতি অবলম্বন করো, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পারো। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১২৩)

ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধে মুসলিমরা যখন অত্যন্ত দুর্বল ও সংখ্যায় কম ছিলেন, তখন মহান আল্লাহ তাঁদের অভাবনীয় বিজয় দান করেছিলেন। সেই বিজয়ের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ মুমিনদের কৃতজ্ঞ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

এক আয়াতে বলা হয়েছে, সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব; আর আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫২)

ইমাম গাজালি লিখেছেন, অন্তরের কৃপণতা ও অহংকার মুছে না গেলে মানুষ কখনো খাঁটি কৃতজ্ঞ হতে পারে না; তাকওয়া মানুষকে অন্যের উপকারের স্বীকৃতি দিতে শেখায় এবং তার ভেতরের অহংবোধ চূর্ণ করে দেয়। (আল-গাজালি, ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, ৪/১২০, দারুল মারিফাহ, বৈরুত, ১৯৮২)

বান্দা যখন সামান্য নেয়ামতের জন্যও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, তখন মহান আল্লাহ তার ওপর সন্তুষ্ট হন। কোরআনে বলা হয়েছে, যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে তিনি তোমাদের ওপর সন্তুষ্ট হন। (সুরা জুমার, আয়াত: ৭)

সৃষ্টির সূচনালগ্নে যখন শয়তান ইবলিস অভিশপ্ত হয়ে বেহেশত থেকে বিতাড়িত হয়েছিল, তখন সে আল্লাহর সামনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছিল যে সে মানুষকে সোজা পথ থেকে বিচ্যুত করবে এবং তাদের অকৃতজ্ঞ বানিয়ে ছাড়বে।

অকৃতজ্ঞতা: শয়তানের প্রাচীন কৌশল

মানুষের মন থেকে কৃতজ্ঞতার বোধ মুছে দেওয়া শয়তানের সুপ্রাচীন চক্রান্ত। সৃষ্টির সূচনালগ্নে যখন শয়তান ইবলিস অভিশপ্ত হয়ে বেহেশত থেকে বিতাড়িত হয়েছিল, তখন সে আল্লাহর সামনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছিল যে সে মানুষকে সোজা পথ থেকে বিচ্যুত করবে এবং তাদের অকৃতজ্ঞ বানিয়ে ছাড়বে।

সে বলেছিল, আপনি তাদের অধিকাংশকেই কৃতজ্ঞ পাবেন না। (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৬-১৭)

বোঝা যায় যে মানুষের মনে অকৃতজ্ঞতার জন্ম দেওয়া শয়তানের অন্যতম প্রধান কৌশল। যখন কোনো মানুষ স্ত্রীর সেবা, স্বামীর কষ্ট, পিতামাতার ত্যাগ কিংবা সহকর্মীর সাহায্যকে সামান্য মনে করে উন্নাসিক হয়, তখন সে মূলত শয়তানের পাতা ফাঁদেই পা দেয়।

কৃতজ্ঞতায় হৃদয় প্রশান্ত হয়

প্রতিদিন ছোট ছোট বিষয় নিয়ে ধন্যবাদ জানানো এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার অভ্যাস মানুষকে মানসিকভাবে অনেক বেশি সুখী ও সুস্থ রাখে। যে মানুষ ধন্যবাদ দিতে জানে, তার ভেতরের মানসিক চাপ ও বিষণ্নতা কম থাকে।

আপনি যখন কোনো মানুষের সামান্য উপকারের জন্যও তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ দেবেন, তখন সেই মানুষটি ভবিষ্যতে আরও বেশি ভালো কাজ করতে উৎসাহিত হবে। সম্পর্কের ভেতরের ছোট ছোট ভালো কাজের প্রশংসা করা দাম্পত্য জীবন ও সামাজিক বন্ধনকে মজবুত করে তোলে।

মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে মূলত আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা আদায় করে না। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫৫)

কারণ এই কৃতজ্ঞতাই আমাদের ইমানকে পূর্ণতা দেয় এবং আমাদের জীবনকে পরম শান্তিময় করে তোলে।