‘কত যে ধীরে বহে মেঘনা/ শান্ত তবু সুপ্ত সে নয়।’ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের এই কালজয়ী গানের কথাগুলো যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে যখন কেউ ‘পরিচ্ছন্ন প্রাঙ্গণে’ দাঁড়িয়ে মেঘনা নদীর দিকে তাকান। নদীর শান্ত ও গভীর রূপ আর উদ্দাম বাতাসের স্পর্শে মন জুড়িয়ে যায় দর্শনার্থীদের। মূলত একটি পার্ক হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে এই ‘পরিচ্ছন্ন প্রাঙ্গণ’-কে। ময়মনসিংহ শহরের ব্রহ্মপুত্রতীরের ‘শিল্পাচার্য জয়নুল উদ্যানের’ মতোই নদীর প্রাকৃতিক রূপ উপভোগ করতে এখানে ভিড় করছেন মানুষ। তবে এই পার্কের বিশেষ আকর্ষণ হলো, এখানে বেড়ানোর পাশাপাশি পাওয়া যাচ্ছে মেঘনার তাজা ইলিশের স্বাদ।

মেঘনার এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে এবং তাজা ইলিশ খেতে হলে যেতে হবে লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার চরবংশী ইউনিয়নের সাজু মোল্লার ঘাটে। রায়পুর শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে এই ঘাটের অবস্থান। উপজেলা প্রশাসন প্রায় ২০ শতাংশ জমির ওপর এই ‘পরিচ্ছন্ন প্রাঙ্গণ’ পার্কটি নির্মাণ করেছে। গত রোববার রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে পার্কটির উদ্বোধন করা হলেও, উদ্বোধনের আগে থেকেই প্রতিদিন শত শত মানুষ এখানে ঘুরতে আসছিলেন। বিশেষ করে ছুটির দিন অর্থাৎ শুক্র ও শনিবার এখানে বিপুল মানুষের সমাগম ঘটছে।

ছোট পরিসরে নির্মিত এই পার্কে দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে হাঁটার ওয়াকওয়ে, বসার বেঞ্চ এবং শিশুদের জন্য দোলনা। পার্কের ভেতরে একটি প্রাচীন বটগাছ সবার নজর কাড়ে, যার গোড়া সুন্দর করে পাথর দিয়ে সাজানো হয়েছে। সবুজ গাছপালা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং মেঘনা নদীর নৈসর্গিক দৃশ্যের সংমিশ্রণে পার্কটি স্থানীয়দের অবসর কাটানোর এক অনন্য আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।

পার্কটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় দোকানদার ও সাধারণ মানুষের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির পাশাপাশি গ্রাম পুলিশ সদস্যরাও নিরাপত্তা কার্যক্রমে সহায়তা করছেন। সবার জন্য উন্মুক্ত এই পার্কে প্রবেশের জন্য কোনো ফি বা মূল্য দিতে হয় না। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে এই পার্ক। এছাড়া পার্কের বাইরে টয়লেটের সুবিধাও রাখা হয়েছে।

পার্কের পাশেই সাজু মোল্লার ঘাটে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন দোকান। সেখানেই রয়েছে ইলিশের বিশেষ রেস্তোরাঁ। এই রেস্তোরাঁয় মেঘনার তাজা ইলিশ ভাজা, ইলিশের ভর্তাসহ বিভিন্ন ধরনের ভর্তা এবং নদীর নানা জাতের মাছ পাওয়া যায়। সন্ধ্যায় যখন পার্কের আলো জ্বলে ওঠে, তখন এক মোহনীয় পরিবেশ তৈরি হয়। সরু হাঁটা পথের পাশে সারি সারি বাতি আর ফুলের বাগান আড্ডা জমানোর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার বড় একটি অংশ মেঘনা নদীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। এই ইউনিয়নের অন্তত ৪০ শতাংশ মানুষ নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন এবং বাকিদের বড় অংশ কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যন্ত এই এলাকায় আগে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার মতো কোনো বিনোদনকেন্দ্র ছিল না। নতুন এই পার্কটি সেই শূন্যতা কিছুটা হলেও পূরণ করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রায়পুর উপজেলার কেরোয়া গ্রামের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান চার বন্ধুকে নিয়ে এই পার্কে ঘুরতে এসেছেন। মুগ্ধ হয়ে তিনি বলেন, ‘পরিচ্ছন্ন প্রাঙ্গণের একদিকে মেঘনা নদী, অন্যদিকে মেঘনার সংযোগ নদী। পার্কে বসে মেঘনার বুকে সূর্য ডুবে যাওয়ার অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়। চারপাশের দৃশ্য ভীষণ সুন্দর।’

সাজু মোল্লার ঘাটে দীর্ঘকাল ধরে রেস্তোরাঁ পরিচালনা করছেন মমিন উল্লাহ। তিনি জানান, এখানে কয়েক বছর ধরে মেঘনার তাজা ইলিশ ভাজা, ইলিশের ভর্তাসহ নদীর নানা ধরনের মাছের স্বাদ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন শত শত মানুষ আসেন। নদীর তাজা মাছের স্বাদ এবং মেঘনার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা পর্যটকদের কারণে তাঁদের ব্যবসায়িক মন্দা দূর হয়েছে এবং আয় বেড়েছে। এর ফলে পার্ককেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে এক ধরনের প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।

উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মতে, এই পার্কের মূল উদ্দেশ্য কেবল বিনোদন নয়, বরং মানুষকে পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ রক্ষায় উৎসাহিত করা। দর্শনার্থীরা যেন জায়গাটির সবুজ পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখেন, সে আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন। বিশেষ করে ময়লা-আবর্জনা না ফেলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, আর সেই উদ্দেশ্যেই এর নামকরণ করা হয়েছে ‘পরিচ্ছন্ন প্রাঙ্গণ’।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাউছার বলেন, ‘সাজানো-পরিচ্ছন্ন ও সবুজ এই ছোট্ট প্রাঙ্গণ দেখে আমাদের সন্তানেরা আগামী দিনের পরিচ্ছন্ন রায়পুর তথা পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ে তোলার দীক্ষা গ্রহণ করবে। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের রায়পুরের এই পরিচ্ছন্ন প্রাঙ্গণের সুবাস ছড়িয়ে পড়বে সারা বাংলাদেশে।’