লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় এক খামারির কাছ থেকে টাকা ছিনতাই, শারীরিক নির্যাতন এবং পরবর্তীতে মিথ্যা মামলা দেওয়ার গুরুতর অভিযোগে রায়পুর থানার সাত পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

ভুক্তভোগী আবদুর রহিমের স্ত্রীর দায়ের করা মামলার প্রেক্ষিতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) একটি তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছিল। তবে ওই প্রতিবেদনের বিষয়ে বাদীপক্ষ সন্তোষ প্রকাশ না করে নারাজি প্রদান করেন। বাদীপক্ষের এই নারাজির আবেদনের প্রেক্ষিতে গতকাল রোববার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মোহাম্মদ রেজাউল হক বিচার বিভাগীয় তদন্তের এই আদেশ প্রদান করেন।

ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, রায়পুর উপজেলার চরপাতা ইউনিয়নের পূর্ব চরপাতা গ্রামের শহিদুল্লাহর ছেলে আবদুর রহিম পেশায় একজন খামারি ছিলেন। তিনি গ্রামে গরু ও মাছের খামার করতেন। ২০২৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর গরু বিক্রি করে তিনি ৯০ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। অভিযোগ করা হয়েছে, পথে রায়পুর থানার সাত পুলিশ সদস্য তাঁকে আটক করে এবং তাঁর কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নিয়ে তাঁকে মারধর করেন। এরপর তাঁকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

ঘটনার পরদিন পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে রায়পুর থানায় তিনটি মামলা দায়ের করে। রায়পুর থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আবু হানিফ বাদী হয়ে ডাকাতির প্রস্তুতি, অস্ত্র আইন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেন। এই মামলাগুলোর প্রেক্ষিতে আবদুর রহিমকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। তিনটি মামলা এখনো আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এই মামলায় তিনি ছয় মাস কারাগারে বন্দি ছিলেন এবং ২০২৪ সালের ১৯ জুন জামিনে মুক্তি পান।

এদিকে, গরু বিক্রির পর আবদুর রহিম বাড়ি না ফিরলে তাঁর স্ত্রী রিনা আক্তার বিভিন্ন স্থানে খোঁজ শুরু করেন। অবশেষে তিনি জানতে পারেন যে তাঁর স্বামীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। ওই বছরের ২৭ ডিসেম্বর রিনা আক্তার এই ঘটনার প্রতিকার চেয়ে আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলায় রায়পুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আবু হানিফ, নুরুল ইসলাম ও মো. হানিফ, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) শফিক মিয়া ও সাখাওয়াত হোসেন এবং কনস্টেবল আতিক উল্যা ও ইউসুফ ঢালিকে আসামি করা হয়।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০২৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রায়পুর-চাঁদপুর সড়কের চরপাতা ইউনিয়নের বর্ডার বাজার এলাকা থেকে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা আবদুর রহিমকে আটক করেন। তখন তাঁর কাছে গরু বিক্রির ৯০ হাজার টাকা ছিল। এজাহারে অভিযোগ করা হয়, ওই টাকা নিয়ে তাঁকে মারধর করা হয়। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সেখানে পানি খেতে চাইলে টিউবওয়েলের সঙ্গে তাঁর মাথা ঠুকে আঘাত করা হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এজাহারে আরও বলা হয়, স্বামীকে আটকের খবর পেয়ে রিনা আক্তার রায়পুর থানায় গিয়ে একাধিকবার খোঁজ করেন। কিন্তু তাঁর সন্ধান পাননি। পরে সদর থানা, গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয় ও জেলা কারাগারেও খোঁজ নেন তিনি। কোথাও স্বামীর সন্ধান না পেয়ে আবার রায়পুর থানায় গেলে সেখানে আবদুর রহিমের মোটরসাইকেল দেখতে পান। এরপর নিশ্চিত হন পুলিশই তাঁকে নিয়ে গেছে।

মামলায় অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা বর্তমানে রায়পুর থানা থেকে বদলি হয়ে গেছেন। তবে মামলা দায়েরের পর সে সময় রায়পুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আবু হানিফ ও নুরুল ইসলাম এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে মিথ্যা অভিযোগে আদালতে মামলা করা হয়।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, রিনা আক্তারের করা মামলাটি প্রথমে তদন্তের জন্য জেলা পুলিশকে দেওয়া হয়। পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি এর বিরুদ্ধে নারাজি দেন বাদী। পরে আদালত মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), নোয়াখালী কার্যালয়কে। পিবিআইয়ের প্রতিবেদনেও নারাজি দেন বাদী। এরপর একই বছরের ৯ জুলাই মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি।

চলতি বছরের ২ জুলাই সিআইডি আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধেও গত ১৭ আগস্ট নারাজির আবেদন করেন বাদী। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত নারাজি মঞ্জুর করেন এবং গতকাল মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী আবদুল আহাদ শাকিল পাটওয়ারী বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামিদের বিষয়ে সঠিকভাবে তদন্ত না করে প্রভাবিত হয়ে প্রতিবেদন দিয়েছেন বলে বাদীপক্ষের অভিযোগ। তাঁর দাবি, রায়পুর থানা ও হাসপাতালের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংরক্ষিত হার্ডডিস্ক জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়নি। এ ছাড়া বাদীপক্ষের সাক্ষীদের বক্তব্য যথাযথভাবে আমলে নেওয়া হয়নি। এসব কারণে সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেওয়া হয়। আদালত আবেদন মঞ্জুর করে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।