নওগাঁ সদর উপজেলায় সারের তীব্র সংকট চলাকালীন অন্য জেলায় সার পাচারের এক বড় প্রচেষ্টাকে রুখে দিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাত আনুমানিক ১০টার দিকে দুবলহাটি-হাপানিয়া সড়কে এই ঘটনাটি ঘটে।
ডিলার পয়েন্ট থেকে কৌশলে সার অন্য জেলায় পাঠানোর সময় এলাকাবাসী তৎপর হয়ে দুটি গাড়িতে থাকা মোট ১২০ বস্তা ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সার আটকে দেন এবং দ্রুত প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করেন। খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে সারভর্তি গাড়ি দুটি জব্দ করে এবং জব্দকৃত সারগুলো দুবলহাটি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নওগাঁ সদরের দুবলহাটি এলাকায় অবস্থিত বিসিআইসি ডিলার পয়েন্ট ‘মেসার্স মোল্লা ট্রেডার্স’-এর মালিক ওয়াসেফ আলী মোল্লার গুদাম থেকে দুটি নসিমন-ভটভটিতে করে ১২০ বস্তা ডিএপি সার লোড করা হয়। গাড়ি দুটি যখন রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়, তখন হাপানিয়া সড়কের মুখে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। পথিমধ্যে এলাকাবাসী নসিমন দুটি থামিয়ে চালকদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা প্রথমে অসংলগ্ন তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। তবে পরবর্তীতে চাপ সৃষ্টি করা হলে তারা স্বীকার করেন যে, সারগুলো রাজশাহীর উদ্দেশে নেওয়া হচ্ছিল।
সারের চরম অপ্রতুলতার মধ্যে এভাবে এলাকার সার বাইরে পাঠানোর চেষ্টা দেখে স্থানীয় কৃষকরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। শরিফুল নামে এক ভুক্তভোগী কৃষক বলেন, ‘মাঠে সার দেওয়ার সঠিক সময় এখন। অথচ আমরা ডিলার পয়েন্টে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরেও সার পাচ্ছি না। আমাদের নাকের ওপর দিয়ে এলাকার সার অন্য জেলায় পাচার হয়ে যাচ্ছে।’
জাহিদুল নামের অপর এক স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, ‘গত তিন দিন ধরে ঘুরেও এক বস্তা সার পাইনি। অথচ ডিলাররা নিজেদের স্বার্থে ইউনিয়নের বরাদ্দ করা সার পাশের জেলায় পাঠিয়ে দিচ্ছে। এলাকাবাসী সঠিক সময়ে গাড়ি দুটি না আটকালে এই সার অনায়াসেই হাতছাড়া হয়ে যেত।’
ঘটনার একপর্যায়ে মেসার্স মোল্লা ট্রেডার্সের ম্যানেজার মামুন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে এলাকাবাসীর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। মামুন দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানের মালিক ওয়াসেফ আলী মোল্লার নির্দেশেই তিনি ১২০ বস্তা সারের মেমো করে গাড়ি দুটি ইন্টিতলা বাজারের উদ্দেশে ছেড়ে দিয়েছিলেন। তবে মালিক এই সার কার কাছে বিক্রি করেছেন বা কোথায় পাঠাচ্ছিলেন, তা তার জানা ছিল না। তবে প্রশাসনের গাড়ি পৌঁছানোর খবর পেয়েই তিনি সুকৌশলে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।
এদিকে, সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে সারের বস্তাসহ দুটি নসিমন ভটভটি গাড়ি আটক করেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নূরুল আমিন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে জানান, “এখানে সার ডিলার ওয়াসেফ আলী মোল্লার গোডাউন থেকে ১শর অধিক সার অন্য জেলায় পাচার হচ্ছে এমন তথ্য স্থানীয়দের কাছে থেকে তিনি পান। খবর পেয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও পুলিশ প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন তিনি। এখানে এসে তিনি দেখতে পান স্থানীয় জনগণ দুইটি গাড়ি আটক করে রেখেছে । দুই গাড়িতে ৬০ বস্তা করে ১২০ বস্তা সার রয়েছে । যেহেতু ডিলারকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি বা তার কোনো প্রতিনিধিকে পাওয়া যায়নি। তার ম্যানেজার প্রশাসন আসার খবরে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়েছেন। যে সার গুলো পাওয়া গেছে, সেগুলো সার আইন ২০০৬ মোতাবেক সারগুলো জব্দ করা হয়েছে। জব্দ করা ১২০ বস্তা সার দুবলহাটি ইউনিয়ন পরিষদে সংরক্ষণ করা হবে এবং তা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার তত্বাবধয়নে দুবলহাটি ইউনিয়নের কৃষকদের মাঝে সরকার নির্ধারিত মূল্যে তা বিক্রি করে যে মূল্য হবে, তা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হবে।”
মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুনিরুল ইসলামসহ পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ভুক্তভোগী কৃষকদের দাবি, এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা অসাধু ডিলারের বিরুদ্ধে যেন দ্রুত কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ডিলার সার নিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরির সাহস না পায়।