ভোলার ইলিশায় নদীপথে সার পাচারের সন্দেহে ২৯০ বস্তা সার আটক করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরবর্তীতে খবর পেয়ে ওই সারগুলো জব্দ করে একটি গোডাউন সিলগালা করেছেন ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সজল কুমার দাশ।

ঘটনাটি ঘটেছে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাতে ভোলা সদর উপজেলার পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের চর ইলিশা গ্রামের দারগার খাল এলাকায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভোলার কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি সার অধিক মূল্যে বিক্রির উদ্দেশ্যে জেলার বাইরে পাচার করা হচ্ছিল। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের দাবি, সারগুলো বিভিন্ন চরের কৃষকদের কাছে পাঠানোর জন্যই নেওয়া হচ্ছিল।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার নদীপথে ভোলা থেকে মাদারীপুরে সার নিয়ে যাওয়ার সময় সন্দেহ হলে স্থানীয় লোকজন সারবোঝাই একটি ট্রলার ও একটি নসিমন থেকে ২৯০ বস্তা সার আটক করেন। প্রতিটি বস্তায় ৫০ কেজি করে সরকারি মূল্য নির্ধারিত টিএসপি ও ডিএপি (ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট) সার ছিল।

আটককৃত ট্রলারের মাঝি শহীদ জানান, চর ইলিশা গ্রামের রফিক মাঝি ও মন্নান বিএডিসি সার ও বীজ ডিলার মেসার্স মিজান ট্রেডার্স থেকে এই সারগুলো কিনেছেন। ভোলার বিভিন্ন চরের কৃষকদের কাছে পাঠানোর জন্য সেগুলো তার মাধ্যমে নেওয়া হচ্ছিল। তিনি দাবি করেন, "জেলার বাইরে পাচারের উদ্দেশ্যে সারগুলো নেওয়া হচ্ছিল না।"

কৃষক রফিকও দাবি করেন, তিনি সারগুলো কিনে চরে পাঠানোর জন্য নৌকায় তুলছিলেন। স্থানীয়রা না বুঝে সেগুলো আটক করেছেন। তবে সার কেনার কোনো বৈধ রসিদ তিনি দেখাতে পারেননি।

অন্যদিকে, স্থানীয় কৃষক মাইনুদ্দিন জানান, ট্রলারের মাঝি শহীদের কাছ থেকে পাওয়া একটি রসিদে ৮০ বস্তা ডিএপি সারের মূল্য প্রতি বস্তা ১ হাজার ১৫০ টাকা হিসেবে মোট ৮৪ হাজার টাকা উল্লেখ রয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, "৮০ বস্তার রসিদ থাকলে বাকি ২১০ বস্তা সার কোথা থেকে এলো?"

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ভোলার সাধারণ কৃষকদের কাছে স্বল্পমূল্যে সার বিক্রি না করে অধিক মুনাফার আশায় সেগুলো জেলার বাইরে নেওয়া হচ্ছিল। এ ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিএডিসি সার ডিলারের লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানান তিনি।

কৃষক মাকসুদ অভিযোগ করেন, ডিলাররা কৃষকদের নামে ভুয়া ভাউচার তৈরি করে সার উত্তোলন করেন এবং পরে বেশি দামে বিক্রির আশায় জেলার বাইরে নিয়ে যান। এতে ভোলার কৃষকরা প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না। তার অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে সারের সংকট থাকলেও ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অধিক মুনাফা করছেন।

কৃষকদের আরও অভিযোগ যে, ডিলারদের সিন্ডিকেটের কারণে প্রতি দুই দিন পর পর সারের দাম বাড়ছে। ফলে অধিক মূল্য দিয়েও প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে না পেরে ফসল উৎপাদন নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়ছেন তারা।

এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিএডিসি সার ও বীজ ডিলার মেসার্স মিজান ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মিজানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। খবর পেয়ে ইলিশা থানা-পুলিশ সারগুলো জব্দ করে রাখে।

ভোলা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান বলেন, ডিলার পয়েন্টের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সারগুলো ভেলুমিয়া, ভেদুরিয়া ও বরিশালের আলিমাবাদ ইউনিয়নের কৃষকদের জন্য নেওয়া হচ্ছিল। বিভিন্ন চরে তরমুজ, ক্যাপসিকাম, চিচিঙ্গা ও শসা চাষের জন্য কৃষকরা সারগুলো কিনেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, কোনো কৃষক বা ডিলার অবৈধভাবে কাগজপত্র তৈরি করে সার উত্তোলন করেছেন কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরবর্তীতে রাতে ২৯০ বস্তা সার উদ্ধার করে স্থানীয় একটি গোডাউন সিলগালা করেন ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সজল চন্দ্র শীল।

ইউএনও সজল কুমার দাস বলেন, "সারগুলোর বৈধ কাগজপত্র তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তাই যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সারগুলো উদ্ধার করে স্থানীয় একটি গোডাউনে রাখা হয়েছে এবং গোডাউনটি সিলগালা করা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে সার পাচার বা অবৈধভাবে মজুদের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।