বলিউডের জনপ্রিয় তারকা সাইফ আলী খান এবং সোহা আলী খানকে নিয়মিত রুপালি পর্দায় দেখা গেলেও তাঁদের বোন সাবা আলী খান সবসময়ই প্রচারের চাকচিক্য থেকে দূরে থেকেছেন। অভিনয়কে তিনি পেশা হিসেবে গ্রহণ করেননি। তবে পরিবারের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা দুই ভাই-বোনের চেয়ে কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং ভোপালের নবাব পরিবারের হাজার কোটি রুপির সম্পদ ও ঐতিহ্যের একটি বিশাল অংশের রক্ষণাবেক্ষণের গুরুদায়িত্ব পালন করছেন সাবা।

সম্প্রতি 'শিট দ্য পিপল টিভি'-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে নিজের এই বিশেষ দায়িত্ব সম্পর্কে কথা বলেছেন সাবা পতৌদি। তিনি জানান, তাঁর বাবা প্রয়াত মনসুর আলী খান পতৌদি—যিনি ক্রিকেট বিশ্বে ‘টাইগার পতৌদি’ নামে অত্যন্ত পরিচিত ছিলেন—তিনিই পরিবারের এই ঐতিহ্যকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব সাবার হাতে অর্পণ করেছিলেন।

সাক্ষাৎকারে সাবাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, পরিবারের এই উত্তরাধিকারের আর্থিক মূল্য কি ১ হাজার কোটি রুপির বেশি? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি সম্মতি জানান। তবে সাবার মতে, এই দায়িত্ব পালন করা কেবল সম্পদ রক্ষা কিংবা অর্থের হিসাব রাখার বিষয় নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে ধর্মীয় ঐতিহ্য, জনকল্যাণ এবং অসংখ্য মানুষের সেবার মানসিকতা।

সাবা বর্তমানে ‘আওকাফ-এ-শাহি’ ট্রাস্টের মুতাওয়াল্লি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ওয়াক্ফ সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক বা ব্যবস্থাপককে মুতাওয়াল্লি বলা হয়। ভোপালের নবাব পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত এই ট্রাস্টের অধীনে থাকা বিভিন্ন স্থাপনা ও সম্পদের দেখভাল করা তাঁর নিয়মিত দায়িত্বের অংশ। উল্লেখ্য, তাঁর দাদি সাজিদা সুলতান এবং বাবা মনসুর আলী খান পতৌদিও একসময় এই ট্রাস্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

সাবা জানান, ভোপালের এই প্রকল্পের সঙ্গে সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনায় হজযাত্রীদের আবাসনের ব্যবস্থাও জড়িত। ভোপাল থেকে যারা হজ করতে যান, তাঁদের থাকার সুবিধা নিশ্চিত করতে সেখানে ঐতিহ্যবাহী অতিথিশালা বা রুবাতের ব্যবস্থা করা হয়। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ভবন অধিগ্রহণসহ নানা ধরনের প্রশাসনিক কাজ করতে হয়।

ট্রাস্টের অধীনে থাকা মসজিদ এবং অন্যান্য স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও সামলান সাবা। তিনি জানান, এই কাজে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হলেও সেই অর্থ ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করা হয় না, কিংবা ভারতে ফিরিয়ে এনে ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে ভোগ করা হয় না। পরিবারের সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক অত্যন্ত ঐতিহ্যগত।

সাবার বিশ্বাস, তাঁর বাবা তাঁকেই এই দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কারণ তাঁর বাবার ধারণা ছিল, পরিবারের এই উত্তরাধিকার সামলানোর জন্য একজন মেয়েই বেশি উপযুক্ত। পুরুষপ্রধান পরিবেশে কাজ করতে হলেও নিজের দৃঢ় অবস্থান ধরে রেখেছেন তিনি। সাবা বলেন, “তারা আমাকে সম্মান করে, কারণ তারা জানে আমি কাজের ব্যাপারে আন্তরিক এবং আমাকে সহজে দমিয়ে রাখা যায় না।”

সাবা আরও জানান, ভোপালের পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বর্তমানে কয়েকটি মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এসব আইনি জটিলতার নিষ্পত্তি হয়ে গেলে তিনি নারী ও শিশুদের কল্যাণে কাজ করার পরিকল্পনা করেছেন। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য একটি স্কুল, নারীদের জন্য একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এবং গ্রামীণ নারীদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার উদ্যোগ নিতে চান তিনি।

সাবার এই দায়িত্বের গুরুত্ব বুঝতে হলে পতৌদি ও ভোপালের নবাব পরিবারের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। তাঁর দাদি সাজিদা সুলতান ছিলেন ভোপালের শেষ শাসক নবাব হামিদুল্লাহ খানের মেয়ে। হামিদুল্লাহ খান ১৯৬০ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভোপালের নবাব ছিলেন। তাঁর বড় মেয়ে আবিদা বেগম ১৯৫০ সালে পাকিস্তানে চলে যাওয়ার পর ছোট মেয়ে সাজিদা উত্তরাধিকার সূত্রে পরিবারের সম্পত্তি ও উপাধির দায়িত্ব পান। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই সম্পত্তির মূল্য ১৫ হাজার কোটি রুপির বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাজিদা সুলতানের বিয়ে হয়েছিল পতৌদির নবাব ইফতিখার আলী খানের সঙ্গে। তাঁদের ছেলে মনসুর আলী খান পতৌদি ছিলেন ভারতের বিখ্যাত ক্রিকেটার। অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুরকে বিয়ে করেন তিনি। তাঁদের তিন সন্তান—সাইফ, সোহা ও সাবা। এভাবেই দুই নবাব পরিবারের ঐতিহ্য এক সূত্রে মিলেছে। সাবা অবশ্য নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছেন ভিন্ন পথে। চলচ্চিত্রে অভিনয় না করলেও পরিবারের ঐতিহ্য ও সম্পত্তি রক্ষার গুরুদায়িত্ব তাঁকে আলোচনায় এনেছে। সম্প্রতি বোন সোহা আলী খানের ইউটিউব চ্যানেলে নিজের স্বাস্থ্যসংকটের কথা জানিয়েছিলেন তিনি। মাত্র ২৭ বছর বয়সে তাঁর মস্তিষ্কে একটি টিউমার ধরা পড়ে। অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তার কথা জানার পর জীবন যে মুহূর্তে বদলে গিয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে সাবা জানিয়েছিলেন, “এমন ঘটনা মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে দিলেও একই সঙ্গে লড়াই করার শক্তিও জোগায়।”