রেলওয়ের যেসব জমি অবৈধভাবে দখল হয়ে আছে, সেগুলো চিহ্নিত করে দখলমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন রেলপথমন্ত্রী শেখ মো. রবিউল আলম। তাঁর মতে, উদ্ধার করা এই জমিগুলো প্রথমে রেলওয়ের নিজস্ব প্রয়োজনে এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রের সামগ্রিক প্রয়োজনে ব্যবহার করা হবে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মন্ত্রী এসব কথা জানান।
সৈয়দপুরে রেলওয়ের আবাসন পরিস্থিতি ও জমি দখল প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, “সৈয়দপুরে রেলওয়ের প্রায় ২ হাজার ৪০০টি আবাসন রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯০০টিতে মানুষ বসবাস করেন। ফলে সেখানে আবাসনের সংকট নেই।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, পুরোনো ভবন এবং আবাসনের জন্য বেতন থেকে গৃহঋণের কিস্তি কাটার বিষয়টি বিবেচনায় অনেকে বাইরে তুলনামূলক কম ভাড়ায় ভালো বাসা পাওয়ায় রেলওয়ের আবাসনে থাকতে আগ্রহী হন না।
জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলমান বিরোধের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, “রেলওয়ের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ একর জমি পৌরসভার দখলে রয়েছে।” এই বিরোধটি বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। মঙ্গলবারের সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ (ইউএনও) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
রেলওয়ের জমি ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, রেলওয়ের জমি ব্যক্তি বা কোনো গোষ্ঠীকে লাইসেন্সের ভিত্তিতে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয় এবং এর জন্য প্রতিবছর নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করতে হয়। তবে বর্তমানে জমি লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা হয়েছে। রেলওয়ের জমি কোথায় এবং কী পরিমাণ দখল হয়ে আছে, তা চিহ্নিত করে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং এরপর দ্রুত সেসব জমি দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রেলওয়ের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রেলব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা এবং যাত্রীসেবা আরও উন্নত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশের রেলযাত্রার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে এবং বর্তমানে এর প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে। তাই রেলসেবা আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন, যা সরকারের একটি নির্বাচনি অঙ্গীকার। এই পরিকল্পনায় রেলওয়ের দুটি কারখানাকে কীভাবে সম্পৃক্ত করা যায়, তা খতিয়ে দেখতেই তিনি সৈয়দপুরে এসেছেন। পরিদর্শনের মাধ্যমে কারখানার সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া গেছে বলে তিনি জানান।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় কোচ মেরামতের মানোন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে মন্ত্রী বলেন, কারখানায় তৈরি কিছু যন্ত্রাংশের মান পরীক্ষা করে তারা সন্তুষ্ট হয়েছেন। তবে কোচ মেরামতের কাজ আরও মানসম্মত করার সুযোগ রয়েছে। তিনি মনে করেন, পুরোনো কিছু যন্ত্রপাতি ভালো মানের হলেও জানালা ও কোচের বিভিন্ন অংশ মেরামতের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ও মানসম্মত পদ্ধতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
মন্ত্রী আরও জানান, রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ৪০০টি কোচ মেরামতের অপেক্ষায় রয়েছে। এই কোচগুলো দ্রুত মেরামত করে পুনরায় সচল করতে দক্ষ কারিগর নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
রেলওয়ে হাসপাতালগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলে তিনি বলেন, রেলওয়ের পক্ষে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই সমস্যা সমাধানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। দেশের প্রায় নয়টি রেলওয়ে হাসপাতাল যৌথ ব্যবস্থাপনায় কীভাবে পরিচালনা করা যায়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার গৌরবময় অতীতের কথা স্মরণ করে মন্ত্রী বলেন, একসময় এই কারখানাটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করত। ১৮৬২ থেকে ১৮৭০ সালের মধ্যে এখানে কারখানা প্রতিষ্ঠার ইতিহাস রয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে রেলওয়ের প্রয়োজনীয়তা বাড়লেও কারখানাটির উন্নয়ন সেভাবে হয়নি।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, একসময় এই কারখানায় প্রায় ১২ হাজার ধরনের যন্ত্রাংশ তৈরি হতো, যা বর্তমানে কমে মাত্র ৬৫৪ থেকে ৬৫৫টিতে নেমে এসেছে। ফলে এখন অনেক যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। অথচ এই কারখানায় আরও অনেক ধরনের যন্ত্রাংশ উৎপাদন করার সক্ষমতা রয়েছে এবং সেই সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব।