কালীগঞ্জ পৌরসভা শহরের যানজট নিরসন ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে একটি হকার্স মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছ থেকে ৫ দশমিক ৭০ একর জমি বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে। শহরের নতুন বাজার এলাকার মিনি স্টেডিয়ামের পূর্ব পাশে লেকসংলগ্ন নতুন সলিং সড়কের ধারে এ মার্কেট নির্মাণ করা হবে।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, কালীগঞ্জ শহরের মেইন বাসস্ট্যান্ড থেকে বড়বাজারের নলডাঙ্গা রোড, কোলা রোড, থানা রোড ও কলেজ রোডের ফুটপাতজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা দোকান বসিয়ে আসছেন। এতে সড়কের জায়গা সংকুচিত হয়ে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। ব্যস্ত সময়ে এসব এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়, ফলে পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি নিয়মিত যাতায়াতকারী মানুষজনও ভোগান্তিতে পড়েন।
পৌর কর্তৃপক্ষ জানায়, ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ না করে নির্দিষ্ট স্থানে পুনর্বাসনের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। এর মাধ্যমে একদিকে ব্যবসায়ীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের জায়গা তৈরি হবে, অন্যদিকে শহরের সড়ক ও ফুটপাত যানজটমুক্ত রাখা সম্ভব হবে।
হকার্স মার্কেট নির্মাণ কমিটির সভাপতি হামিদুল ইসলাম মনা বলেন, শহরের যানজট নিরসন ও মানুষের দুর্ভোগ কমানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের নিয়ে প্রাথমিকভাবে আলোচনা করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে আরও একটি সভা করা হবে। পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা নাহিদের উপস্থিতিতে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, যারা হকার্স মার্কেটে যেতে আগ্রহী, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আলোচনার পরও কেউ ফুটপাত ছাড়তে রাজি না হলে পর্যায়ক্রমে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। আগামী তিন মাসের মধ্যে মার্কেটটি চালু করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। চা দোকানি জাহিদ হাসান বলেন, আমরা জানতে পেরেছি, হকার্স মার্কেট হলে সেখানে যেতে হবে। ইতোমধ্যে ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপিও দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এখানে ব্যবসা করছি। এ জায়গায় ক্রেতা বেশি হওয়ায় বেচাকেনাও ভালো। অন্য জায়গায় গেলে ব্যবসা জমাতে সময় লাগবে। তবে সরকার যদি এখান থেকে সরিয়ে দেয়, তাহলে বিকল্প জায়গায় ব্যবসা করতে হবে।
কাপড় ব্যবসায়ী সলেমান হোসেন বলেন, এখানে প্রায় দেড়শ ব্যবসায়ী ব্যবসা করেন। নতুন জায়গায় গেলে সেখানে ব্যবসা জমতে সময় লাগবে। আমরা শুনেছি, সেখানে পাকা দোকানঘর হবে এবং দোকান নিতে পৌরসভাকে টাকা দিতে হতে পারে। অগ্রিম টাকা ও মাসিক ভাড়া কত হবে, তা এখনো জানানো হয়নি। ব্যবসায়ীদের সামর্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
ডাব বিক্রেতা শাহজাহান বলেন, ব্যবসার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা করে দিলে আমরা যেতে রাজি। তবে এক জায়গা থেকে তুলে দেওয়ার পর যেন পরে আবার উচ্ছেদ করা না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
ফল বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, হকার্স মার্কেট হলে আমরা সেখানে যেতে চাই। তবে দোকানের জন্য অতিরিক্ত টাকা দিতে হলে অনেকের পক্ষে ব্যবসা করা কঠিন হবে। সম্ভব হলে কম খরচে দোকান দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত।
অন্যদিকে, সড়কের পাশে জহুরুল মার্কেটের ব্যবসায়ী রুপসাগর গ্লাস হাউজের মালিক আনোয়ার হোসেন পৌরসভার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা দোকানের জন্য বড় অঙ্কের অগ্রিম টাকা ও মাসিক ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করি। ফুটপাতের দোকানের কারণে আমাদের দোকানে ক্রেতা ঢোকা এবং পণ্য ওঠানামার ক্ষেত্রে সমস্যা হয়। মালামালবাহী গাড়ি দাঁড়ানোর জায়গাও পাওয়া যায় না। ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের কারণে প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়। তাদের নির্দিষ্ট জায়গায় পুনর্বাসন করা হলে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ—উভয়েরই সুবিধা হবে।
কালীগঞ্জ পৌরসভার প্রকৌশলী কবির হাসান বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছ থেকে ৫ দশমিক ৭০ একর জমি কালীগঞ্জ পৌরসভার নামে বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে হকার্স মার্কেটের নকশা প্রস্তুত করা হয়েছে। ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা দোকান নিতে চাইলে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে নিচে ইটের গাঁথুনি দিয়ে ওপরের অংশে লোহার অ্যাঙ্গেল ও টিনের ছাউনি দিয়ে মার্কেট নির্মাণ করা হবে। ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে এটিকে বহুতল মার্কেটে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। দ্রুতই নির্মাণকাজ শুরু করার প্রস্তুতি চলছে।
কালীগঞ্জ পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, শহরের ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করার কারণে যানজটের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চলাচলে দুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যেই হকার্স মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যারা ফুটপাত ছেড়ে হকার্স মার্কেটে আসবেন, দোকান বরাদ্দের ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে পৌরসভাকে নকশা প্রস্তুতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু হবে বলে আশা করছি। মার্কেটটি চালু হলে শহরের যানজট অনেকাংশে কমে আসবে।
ইউএনও বলেন, যারা নির্ধারিত সময়ের পরও ফুটপাত ছাড়বেন না, তাদের বিরুদ্ধে নিয়ম অনুযায়ী উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। একই সঙ্গে হকার্স মার্কেটে দোকান বরাদ্দ পাওয়ার পর ফুটপাতে ব্যবসা করার সুযোগ আর দেওয়া হবে না। তাই ব্যবসায়ীদের আগেই বিকল্প স্থানে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।