টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলায় চারটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম নিয়ে চরম বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক এবং সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতিনিয়ত নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিদ্যালয়গুলোর নাম সংশোধন বা পরিবর্তনের কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় এই সমস্যা দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। এমনকি নামের এই অসামঞ্জস্যতার কারণে একবার এক বিদ্যালয়ে জাল ভোটের ঘটনায় পুলিশ ভুল করে অন্য বিদ্যালয়ে চলে গিয়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে একই গ্রামের দুটি বিদ্যালয়ের নামের শেষে ‘১’ ও ‘২’ যোগ করা হলেও সরকারি নথিপত্রে এখনো এর স্থায়ী সমাধান হয়নি।
সখীপুর উপজেলা সদর থেকে পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে সখীপুর-সীডস্টোর সড়কের পাশে অবস্থিত কীর্তনখোলা গ্রাম। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই গ্রামেই অবস্থিত কালিয়ানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আবার এই বিদ্যালয় থেকে দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত কালিয়ানপাড়া গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কীর্তনখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
এক গ্রামের নামে অন্য গ্রামে কীভাবে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলো, সেই ইতিহাস শুনিয়েছেন কীর্তনখোলা গ্রামের বাসিন্দা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মালেক। তিনি জানান, এই গল্পটি তিনি তাঁর বাবা ও দাদার কাছ থেকে শুনেছেন। আবদুল মালেক বলেন, “কীর্তনখোলা গ্রামের কালিয়ানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি করার ক্ষেত্রে কীর্তনখোলা ও কালিয়ানপাড়া—দুই গ্রামের মানুষেরই অবদান ছিল। তবে প্রতিষ্ঠার সময় মুরুব্বিদের মধ্যে এমন আলোচনাও ছিল, কালিয়ানপাড়ার মানুষ একটা সময় পর নিজেদের ‘বঞ্চিত’ ভাবতে পারেন। কারণ বিদ্যালয়টি কীর্তনখোলা গ্রামে স্থাপন করা হবে। পরে মুরুব্বিরা সিদ্ধান্ত নেন, বিদ্যালয় কীর্তনখোলা গ্রামে স্থাপিত হলেও নামকরণ হবে কালিয়ানপাড়ার নামে। এমন সিদ্ধান্তে দুই গ্রামের মানুষই সন্তুষ্ট হন।”
এর ২৭ বছর পর ১৯৬৫ সালে কালিয়ানপাড়ার স্থানীয় বাসিন্দারা আরেকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় এলাকার মুরুব্বিরা সিদ্ধান্ত নেন, যেহেতু কীর্তনখোলা গ্রামে কালিয়ানপাড়া নামে একটি বিদ্যালয় রয়েছে, তাই কালিয়ানপাড়া গ্রামের নতুন এই বিদ্যালয়ের নাম হবে কীর্তনখোলার নামে। এই অদ্ভুত নামকরণের ফলে বর্তমানে শিক্ষার্থীরা চরম বিড়ম্বনার শিকার। কালিয়ানপাড়া গ্রামের কীর্তনখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী আমিনা আক্তারের বাবা ও সংগীতশিল্পী রাখাল রফিক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “গ্রাম ও স্কুল আমাদের। অথচ আমাদের বিদ্যালয়ের কথা বলতে গিয়ে অন্য গ্রামের নাম বলতে হয়। আমরা এ ধরনের বিড়ম্বনা আর চাই না।”
নামের এই বিভ্রান্তির কারণে ঘটে যাওয়া একটি অপ্রীতিকর ঘটনার কথা জানান কালিয়ানপাড়া গ্রামের বাসিন্দা কামাল হোসেন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “২০১৭ সালের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে কালিয়ানপাড়া ও কীর্তনখোলা গ্রামের দুটি বিদ্যালয়ে পৃথক ভোটকেন্দ্র ছিল। একবার কালিয়ানপাড়া গ্রামের ভোটকেন্দ্রে জাল ভোট দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই ইউপি সদস্য প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে মারামারি শুরু হয়। বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়।”
কিন্তু কালিয়ানপাড়া গ্রামের বিদ্যালয়টির নাম কীর্তনখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হওয়ায় পুলিশ প্রথমে ভুল করে কীর্তনখোলা গ্রামের বিদ্যালয়ে চলে যায়। সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত দেখে পুলিশ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। পরে তারা জানতে পারে যে মারামারিটি আসলে কালিয়ানপাড়া গ্রামের ভোটকেন্দ্রে হয়েছে। এরপর পুলিশ সেখানে পৌঁছায়। কামাল হোসেন বলেন, “বিদ্যালয়ের নাম গ্রামের নামের সঙ্গে মিল না থাকায় এমন বিভ্রান্তি মাঝেমাঝেই হয়। জরুরি কিছু ঘটনা ঘটলে যে কারও ভুল জায়গায় চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।”
কালিয়ানপাড়া গ্রামে অবস্থিত কীর্তনখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি এবং প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক হামিদা আক্তার এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানান। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সরকারের উচিত বিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করে গ্রামের নামে নামকরণ করা। তা না হলে সারা জীবন এই বিভ্রান্তি থেকেই যাবে। বিদ্যালয়ের নামের সঙ্গে এলাকার নামের মিল থাকলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সরকারি কর্মকর্তাদের জন্যও সুবিধা হবে।”
একই ধরনের জটিলতা দেখা গেছে সখীপুর উপজেলার ‘প্রতিমাবংকী উত্তরপাড়া’ নাম নিয়েও। এখানে মাত্র ৫০০ গজ দূরত্বে একই নামে দুটি স্কুল রয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯৬ সালে এবং অন্যটি ২০০২ সালে। প্রতিমাবংকী উত্তরপাড়া (২) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি সখীপুর পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে এবং এর ৫০০ গজ পূর্বে অবস্থিত প্রতিমাবংকী উত্তরপাড়া (১) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
শিক্ষক ও স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৬ সালে একটি বেসরকারি সংস্থার ব্যবস্থাপনায় প্রথমে প্রতিমাবংকী উত্তরপাড়া কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হতো। পরবর্তীতে ২০০২ সালে এর পাশেই প্রতিমাবংকী উত্তরপাড়া রেজি. প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে আরেকটি স্কুল খোলা হয়, যেখানে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান শুরু হয়।
প্রতিমাবংকী উত্তরপাড়া-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক শামসুল আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “২০১৩ সালে তৎকালীন সরকার সারা দেশের সব বেসরকারি রেজিস্টার্ড বা নিবন্ধিত প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করে। ওই সময় প্রতিমাবংকী উত্তরপাড়া বিদ্যালয়টির নাম থেকে রেজিস্টার্ড (রেজি.) শব্দটি বাদ দিয়ে সরকারি শব্দটি যোগ হয়। অন্যদিকে ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের নাম থেকে কমিউনিটি শব্দ বাদ দিয়ে সেখানেও সরকারি শব্দটি যোগ হয়। এর ফলে প্রতিমাবংকী উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে একই চত্বরে দুটি বিদ্যালয় এক নামই হয়ে যায়।”
সখীপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে জানান, স্থানীয় সব পক্ষ ও জনপ্রতিনিধিরা চাইলে বিদ্যালয়গুলোর নাম পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি উদ্যোগ নিতে পারেন।
স্থানীয়দের মতে, এক সময় বিদ্যালয় দুটি একই ক্যাম্পাসে থাকলেও পরে একটি বিদ্যালয় ৫০০ গজ দক্ষিণ-পশ্চিমে সরিয়ে নেওয়া হয়। বর্তমানে প্রতিমাবংকী উত্তরপাড়া-১ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দারিয়াপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে এবং প্রতিমাবংকী উত্তরপাড়া-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সখীপুর পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত।
নামের এই অসামঞ্জস্যতার কারণে সরকারি বরাদ্দেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রতিমাবংকী উত্তরপাড়া-১ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুমনা নাসরিন বলেন, “আমরা বিদ্যালয়ের খরচে সয়েল টেস্টসহ (মাটি পরীক্ষা) বিভিন্ন কাজে টাকাপয়সা খরচ করে কাজ অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছিলাম। পরে কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, বরাদ্দ করা টাকার বিপরীতে পাশের বিদ্যালয়ের কোড নম্বর দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, পাশের বিদ্যালয়ে কোনো ভবন নেই এবং সেখানে ঊর্ধ্বমুখী ভবন নির্মাণের সুযোগও নেই। কোড নম্বর ভুল হওয়ার কারণে বরাদ্দটি কার্যকর হয়নি এবং দুই বিদ্যালয়ই বঞ্চিত হয়েছে। সুমনা নাসরিন বলেন, “বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের জন্য গ্রামবাসীর স্বাক্ষরসহ একটি আবেদন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠিয়েছিলাম। এখন পর্যন্ত এর কোনো সুরাহা হয়নি। একই নাম থাকায় খুবই সমস্যা হচ্ছে।”
প্রতিমাবংকী উত্তরপাড়া-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা বিল্লাল হোসেন জানান, একই নাম থাকায় শিক্ষা কর্মকর্তা ও সরকারি কর্মকর্তারা প্রায়ই বিভ্রান্ত হন। কোনো বিষয়ে কথা বলার সময় কোন বিদ্যালয়ের কথা বলা হচ্ছে, তা আলাদা করে পরিষ্কার করতে হয়।
এই অদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষার্থীরাও মজা করে। প্রতিমাবংকী উত্তরপাড়া-১ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আমার বাড়ি থেকে দুই বিদ্যালয়ের দূরত্ব একই। রাস্তা ভালো থাকায় আমি উত্তরপাড়া-১ বিদ্যালয়েই পড়ি। পাশের বাড়ির আমার এক চাচাতো ভাই জুনায়েদ পড়ে উত্তরপাড়া-২ বিদ্যালয়ে। আমি ওকে মজা করে বলি, আমি এক নম্বর আর তুই তো ২ নম্বর।”
অন্যদিকে, প্রতিমাবংকী উত্তরপাড়া-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ বলেন, “কেউ যদি প্রশ্ন করে বিদ্যালয়ের নাম কী? আমি বলি, উত্তরপাড়া ২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তখন আমাকে বলে, দুই কেন? বারবার বোঝাতে হয়।”