ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পরিচালিত এক চোরাচালানবিরোধী অভিযানে হামলা ও গুলিতে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। গতকাল সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে বিজিবির ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়নের (৩৯ বিজিবি) কড়াইতলী বিওপির কোম্পানি কমান্ডার নায়েক রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে এই মামলাটি দায়ের করেন।

মামলায় গুলিতে নিহত মো. রুমান মিয়াসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। নাম উল্লেখ করা অন্য দুই আসামি হলেন হালুয়াঘাটের সংগ্র গ্রামের আতিকুল ইসলাম (৪০) এবং শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার পানিহাটা গ্রামের আবদুল্লাহ (৩৫)।

হালুয়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জালাল উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, “বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে মামলাটি হয়েছে।”

ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, গতকাল সোমবার ভোরে হালুয়াঘাট উপজেলার জলজলিয়া এলাকায় বিজিবির চোরাচালানবিরোধী অভিযানের সময় টহল দলের ওপর হামলা চালানো হয়। সেই ঘটনায় গুলিতে রুমান মিয়া নিহত হন। দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের মর্গে রুমানের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হলে রাত ১০টার দিকে জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়। এই ঘটনার প্রেক্ষিতেই রাতে মামলা করে বিজিবি।

মামলার সংক্ষিপ্ত এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সোমবার ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে হালুয়াঘাট সীমান্তে টহল দিচ্ছিল বিজিবি। সেই সময় ১১১৯ নম্বর সীমান্ত পিলার থেকে বাংলাদেশের ভেতরে প্রায় এক হাজার গজ দূরে জলজলিয়া এলাকায় ভারত থেকে অবৈধ পথে চারটি গরু আনার খবর পান বিজিবি সদস্যরা। তাঁরা সেখানে গিয়ে চারটি গরু জব্দ করেন। তবে ফেরার পথে জলজলিয়া এলাকায় চোরাকারবারিরা বিজিবি সদস্যদের পথ আটকান। তাঁরা দেশি অস্ত্র, ধারালো রামদা ও বাঁশের লাঠি নিয়ে বিজিবি সদস্যদের ওপর হামলা চালান। এই সময়ে দুটি গরু ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে এজাহারে জানানো হয়েছে।

এজাহারে আরও বলা হয়, হামলাকারীদের ছত্রভঙ্গ করার উদ্দেশ্যে কড়াইতলী বিওপির কোম্পানি কমান্ডার নায়েক রফিকুল ইসলাম সতর্কতামূলক চারটি ফাঁকা গুলি ছোড়েন। এরপরও চোরাকারবারিরা নিবৃত্ত না হয়ে বিজিবি সদস্যদের ওপর পুনরায় আক্রমণ করেন। এই সময় রামদা দিয়ে রফিকুলের হাতের আঙুলে কোপ দেওয়া হয়। অন্য একজন ব্যক্তি রফিকুলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে ধস্তাধস্তির মধ্যে অস্ত্র থেকে গুলি বেরিয়ে যায় এবং মো. রুমান গুলিবিদ্ধ হন। একই সময়ে অন্য বিজিবি সদস্যদের মারধর করে জখম করা হয়েছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে বিজিবির গুলিতে যুবকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে তাঁর স্বজনরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তাঁরা গতকাল সোমবার সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত হালুয়াঘাট পুরাতন বাসস্ট্যান্ড থানা রোড এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। পরবর্তীতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

নিহত রুমানের ছোট ভাই আবু রায়হান জানান, বিজিবি সদস্যরা রাতে এলাকায় গরু খুঁজছিলেন। ফোন পেয়ে তাঁর ভাই জলজলিয়া গ্রামে যান। ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে বিজিবি তাঁর বড় ভাইকে গুলি করে। তিনি দাবি করেন, তাঁর ভাই স্থানীয় বাজারের ইজারাদার ছিলেন এবং কোনো চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। বাজার থেকে কেনা গরুর কাগজপত্র দেখাতে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।

রুমানের বিষয়ে স্থানীয় ভুবনকুড়া ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুল জব্বার বলেন, ভারতীয় গরু বাজারে বিক্রি করতে আনলে রুমান কাগজপত্র করে দিতেন। তবে তিনি গরু চোরাচালানে জড়িত নন। তিনি অভিযোগ করেন, সীমান্ত দিয়ে নিয়মিত গরু আসে। এসব কারবার ঘিরে বিজিবির সঙ্গে সাপ্তাহিক অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা আছে; কিন্তু ব্যবসায়ীরা যে সপ্তাহে টাকা দেন না, তখন অভিযান চালানো হয়।

বিজিবির ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নুরুল আজিম বায়েজীদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ওই দিন চোরাকারবারিরা অতিরিক্ত বেপরোয়া আচরণ করেন এবং ধারালো অস্ত্র ও লাঠি দিয়ে বিজিবির ওপর হামলা করেন। ফাঁকা গুলির পরও হামলাকারীরা থামেনি; বরং পেছন থেকে বিজিবির এক সদস্যের ওপর আক্রমণ করেন। তখন ধস্তাধস্তির মধ্যে গুলি বেরিয়ে যায় এবং একজনের গায়ে লাগে।”

লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে বিজিবির অধিনায়ক বলেন, “এ ধরনের অভিযোগ তাঁরা গুরুত্বের সঙ্গে নেন। কেউ প্রমাণসহ অভিযোগ দিলে সংশ্লিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কোনো চোরাকারবারিকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।”