জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরাসরি কোনো আসনে নারী প্রার্থী না দেওয়ার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ। তাঁর দাবি, নারী প্রার্থী না দেওয়ার এই সিদ্ধান্তটি ছিল সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক এবং দলের মজলিশে শুরায় এটি চূড়ান্ত করা হয়। তিনি জানান, সেই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৭০ শতাংশ নারী সদস্য জানিয়েছিলেন যে, তাঁরা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত নন।

আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক সম্মেলনে মারদিয়া মমতাজ এসব কথা বলেন। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) আয়োজিত এই সম্মেলনের মূল বিষয় ছিল ‘উইমেন, পাওয়ার অ্যান্ড পলিটিক্যাল অর্ডারস ইন মুসলিম সোসাইটি কনটেক্সটস’।

সম্মেলনের একটি অধিবেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান প্রশ্ন তোলেন যে, জামায়াতে ইসলামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরাসরি কোনো আসনে নারী প্রার্থী দেয়নি। এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলটি নারী প্রার্থী দেবে কি না, তা জানতে চান তিনি।

এর জবাবে মারদিয়া মমতাজ নারী প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্তের নেপথ্য কারণগুলো তুলে ধরেন। তিনি জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জামায়াতের অনেক পুরুষ সদস্য কারাগারে থাকায় তাঁদের পরিবারের দায়িত্বভার নারীদেরই কাঁধে নিতে হয়েছে। পরিবারের আয়ের উৎস প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নারীরা তখন মূলত ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত ছিলেন। এই পরিস্থিতির কারণে তাঁরা রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত হতে পারেননি।

মারদিয়া মমতাজ আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামী নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের কোনো বিরোধিতাই করে না। দলটি জুলাই সনদে অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে নারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সেই প্রস্তুতি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নারী প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে জামায়াতের এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমার মনে হয় না, এবার আমরা সাধারণ আসনে নারী প্রার্থী দিতে পারব। তবে ভবিষ্যতে পারব বলে আমরা আশা করছি। আমরা এর বিরোধী নই। কিন্তু নির্বাচনী মাঠের পরিস্থিতিও আমরা বিবেচনায় নিচ্ছি।’

অধিবেশনে অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান পুনরায় প্রশ্ন করেন, নারী সদস্যদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি জুলাই সনদে উল্লেখ রয়েছে এবং জামায়াতে ইসলামী কোনো নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) ছাড়াই ওই সনদে স্বাক্ষর করেছে। এখন দলীয় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেই অঙ্গীকার রক্ষা না করলে, দলটি ক্ষমতায় গেলে জুলাই সনদের অঙ্গীকারগুলো কতটা বাস্তবায়ন করবে, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয় কি না।

জবাবে মারদিয়া মমতাজ জানান, জুলাই সনদটি এখনো বাধ্যতামূলক নয়, বরং এটি সুপারিশের পর্যায়ে রয়েছে। তাঁর দাবি, কোনো রাজনৈতিক দলই এখনো এই সনদ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তিনি আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামী নারী নেতৃত্বের বিরোধী নয়, তবে নির্বাচনী মাঠের পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, বিএনপিতেও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ নারী নেত্রীদের মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। এর পেছনে কিছু বিশেষ কারণ রয়েছে, যা গভীরভাবে খতিয়ে দেখলে প্রকৃত বিষয়টি বোঝা যাবে।

একই অধিবেশনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেত্রী উমামা ফাতেমা বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নারীরা অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশ নিলেও পরবর্তী সময়ে তাঁদের অনেকেই রাজনীতি থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

উমামা ফাতেমা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কাঠামো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে নারীদের প্রান্তিক করে দেওয়ার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নারী অধিকার নিয়ে কথা বললে নারী রাজনৈতিক নেত্রীদের সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন এবং রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করা হয়। তাঁর মতে, বিএনপি, জামায়াত এবং তরুণদের যে রাজনৈতিক দল—সবার মধ্যেই এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।