আমার এক প্রতিবেশী ইদানীং লেখালেখির প্রতি খুব ঝুঁকে পড়েছেন। তাঁর ভাষ্যমতে পরিস্থিতি এমন যে তাঁর কলম দিয়ে লেখা কেবলই বের হচ্ছে, বের হচ্ছে, সেই পাগলা ঘোড়ার ন্যায় ছুটতে থাকা কলমকে কিছুতেই দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না।

কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কোথাও নিয়মিত লিখছেন কি না। জবাবে তাঁর ফেসবুক পেজ দেখালেন। পেজের নাম ‘মনের গহিন কোণে’। গতকাল এক দিনে তিনি লিখেছেন দুটি গল্প, চারটি কবিতা। সেগুলোতে গড়ে পাঁচ-ছয় শ রিয়্যাক্ট, অর্ধশত মন্তব্য। তাঁর লেখা একটি কবিতা এমন—

‘ভাঙ্গা জীবন, ভাঙ্গা মন—

শিকেয় তুলে রাখি—

কেমন করে কাটচে বলো

আমার জীবন-পাখি!

নয়ন বরা অশ্রু মোর,

নয়ন মানে আঁকি—

মিনতি করি, আর কখনো

দিও না ’ক ফাঁকি!’

শেষে তিনটি স্যাড ইমোজি।

‘ভাঙ্গা জীবন, ভাঙ্গা মন— শিকেয় তুলে রাখি— কেমন করে কাটচে বলো আমার জীবন-পাখি! নয়ন বরা অশ্রু মোর, নয়ন মানে আঁকি— মিনতি করি, আর কখনো দিও না ’ক ফাঁকি!’

প্রথমে ভাবলাম, তিনি ভুল করে ‘কাটছে’ না লিখে ‘কাটচে’ আর ‘ভরা’র পরিবর্তে ‘বরা’ লিখে ফেলেছেন, একটু শুধরে দেওয়া যাক। তবে ‘নয়ন মানে আঁকি’ দেখে মনে হলো, ছন্দ মেলাবার জন্যই হয়তো তিনি আঁখি না লিখে ‘আঁকি’, ‘বরা’ ও ‘কাটচে’ লিখেছেন। কবি যা লেখেন, সেটাই ঠিক।

মাথা নেড়ে সায় দিতে বাধ্য হলাম, নিঃসন্দেহে তিনি একজন কালজয়ী লেখক। অন্তত ‘গতকাল’জয়ী লেখক!

আমাকে তাঁর পেজে ফলো দিতেই হলো। মানে, তিনি নিজেই আমার হাত থেকে ফোন নিয়ে তাঁর পেজে একটা ফলো দিয়ে দিলেন। এমন ডিজিটাল-পারদর্শী লেখক কখনো সামনাসামনি দেখিনি। এমন লেখককে প্রতিবেশী হিসেবে পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার!

এর পর থেকে প্রতিদিনই আমার ফেসবুক ভরে যেতে লাগল ‘মনের গহিন কোণে’র গল্প–কবিতায়। নিঃসন্দেহে এমন উঁচুদরের সাহিত্যিক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ‘নিয়তি ’, ‘মিনতি ’, ‘ভেজা চোখ’, ‘আজ অব্দি ভেবে যাই’—একেকটা শিরোনাম পড়লেই তো কেমন একটা ভাব চলে আসে।

আমার প্রতিবেশী দিনে সর্বনিম্ন চারটি লেখা লেখেন। ইদানীং ধারাবাহিক গল্প লিখতে শুরু করেছেন। এতে মনে হয় আশানুরূপ সাড়া পাননি, মন্তব্যের ঘরে তাই তিনি লিখে রেখেছেন, আশাহত হওয়ায় তিনি আর ধারাবাহিকভাবে লিখবেন না। সেই মন্তব্যে ৪৮টি স্যাড রিয়্যাক্ট পড়েছে।

পাঠক কাম দর্শক হিসেবে বিষয়গুলো ভালোই উপভোগ করছিলাম।

হঠাৎ একদিন খেয়াল করলাম, ‘মনের গহিন কোণে’ থেকে আর লেখা পাওয়া যাচ্ছে না। যেখানে এক দিনে তিনটি লেখা পাওয়া যেত, সেখানে দুদিন ধরে কোনো লেখাই নেই! সেই জাদুকরি কলমের কালি কি ফুরিয়ে গেল? কিন্তু তিনি তো ডিজিটাল কি-বোর্ড ব্যবহার করে লেখেন!

মনের গহিন কোণে’ থেকে আর লেখা পাওয়া যাচ্ছে না। যেখানে এক দিনে তিনটি লেখা পাওয়া যেত, সেখানে দুদিন ধরে কোনো লেখাই নেই! সেই জাদুকরি কলমের কালি কি ফুরিয়ে গেল? কিন্তু তিনি তো ডিজিটাল কি-বোর্ড ব্যবহার করে লেখেন!

ফ্ল্যাটের ছাদে বিকেলে ভাগ্যক্রমে (কিংবা দুর্ভাগ্যক্রমে) সেই প্রতিবেশীর সঙ্গে দেখা হলো। চুপচাপ ছাদের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন। জিজ্ঞেস করলাম—

‘অসুখ করেছে নাকি? ইদানীং লেখা পাচ্ছি না!’

‘রাইটার্স ব্লক।’

অ্যাঁ?

‘রাইটার্স ব্লক হইসে আমার। মানে আমি লিখতে পারতেসি না। হিংসার ফল; খুব ভয়ংকর। আমাকে শেষ করে দিল!’

‘অসুখ করেছে নাকি? ইদানীং লেখা পাচ্ছি না!’ ‘রাইটার্স ব্লক।’ অ্যাঁ? ‘রাইটার্স ব্লক হইসে আমার। মানে আমি লিখতে পারতেসি না। হিংসার ফল; খুব ভয়ংকর। আমাকে শেষ করে দিল!’

জোর দিয়ে বলতে ইচ্ছে হলো, রাইটার্স ব্লক মোটেই হিংসার ফল নয়। কিন্তু বলতে পারলাম না।

স্পিকারস ব্লক! তিনি বলতে থাকলেন—

‘কষা পায়খানার মতন কষ্ট, বুঝছেন? আমি এইটা নিয়ে পড়ছি, সবাই এই বিষয়ে একমত। কাঠিন্যের মতো কঠিন সময় যায়,আপনে এই কষ্টের কী বুঝবেন?’

কী বলব, বুঝতে পারলাম না। প্রতিবেশীর কথাবার্তায় ঠিক আগের মতো সাহিত্যের ছোঁয়া পাচ্ছি না। বড়ই দুঃখজনক! বাস্তবতা!

আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি হঠাৎ হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন।

‘না পারি কইতে, না পারি সইতে! এদিকে হইসে লুজ মোশন...এক শরীরে দুই রকম অসুখ নিয়া আমি চলতেসি!’

প্রতিবেশীর কপোল বেয়ে অদৃশ্য অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা কারও জানা আছে কি?

সম্ভবত না।

রাইটার্স ব্লক অনেক আলোচ্য বিষয় হলেও ‘রাইটার্স লুজ মোশন’ নিয়ে কেউ কথা বলে না।

‘কষা পায়খানার মতন কষ্ট, বুঝছেন? আমি এইটা নিয়ে পড়ছি, সবাই এই বিষয়ে একমত। কাঠিন্যের মতো কঠিন সময় যায়,আপনে এই কষ্টের কী বুঝবেন?’