দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে বর্তমানে প্রায় ২৯৮ থেকে ৩০৩টি শিশু অবস্থান করছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। এসব শিশুর সঠিক বিকাশ এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে ‘অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতি’র মাধ্যমে নিয়মিতভাবে পুষ্টিকর শিশুখাদ্য, পোশাক এবং খেলনা সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে কারাগারে থাকা শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা এবং তাদের সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষায় সমাজসেবা অধিদপ্তর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ প্রদান করেছে।

পুরো বিষয়টি সামনে আসে গত ৮ মে একটি দৈনিকে প্রকাশিত ‘কারাগারে বিপন্ন শৈশব’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে। ওই প্রতিবেদন এবং এই সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিমতকে ভিত্তি করে গত জুন মাসে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কামরুন নাহার মাহমুদ একটি রিট আবেদন দাখিল করেন। গত ১৫ জুন হাইকোর্ট এই আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে রুলসহ অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ প্রদান করেন। আদালতের আদেশে নির্দেশ দেওয়া হয় যে, দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে কতজন শিশু রয়েছে, তাদের বয়স কত এবং তাদের সার্বিক অবস্থা কেমন—তা জানিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। এই প্রতিবেদনটি জমা দেওয়ার জন্য কারা মহাপরিদর্শককে দুই মাস সময় দেওয়া হয়েছিল।

আদালতের সেই নির্দেশের ধারাবাহিকতায় সমাজসেবা অধিদপ্তর রিট আবেদনকারীর বরাবরে প্রতিবেদনটি প্রেরণ করে। রিট আবেদনকারী আইনজীবী কামরুন নাহার মাহমুদ আজ সোমবার মুক্তকণ্ঠকে জানান, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই তিনি সমন্বিত প্রতিবেদনটি হাতে পেয়েছেন। তিনি আরও জানান যে, কারাগারে সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন শাখার মাধ্যমেই শিশুদের তত্ত্বাবধানের কাজ চালানো হয়ে থাকে। সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটি শেষ হয়ে ২৫ অক্টোবর থেকে নিয়মিত আদালত বসবে এবং সেই সময়েই প্রতিবেদনটি আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হবে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের ‘শিশু সুরক্ষা ইউনিট’ ও ‘প্রবেশন শাখা’র সমন্বিত মতামতের ভিত্তিতে তৈরি ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম হলো ‘প্রবেশন অ্যান্ড আফটার কেয়ার সার্ভিসেস’। বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলা এবং আটটি সিএমএম আদালতসহ মোট ৭২টি ইউনিটে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এই কার্যক্রমের আওতায় নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতি’ সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সুপারিশের অংশে প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কারাগারের পরিবেশ দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য মোটেও অনুকূল নয়। তাই কারাবন্দি শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ এবং তাদের সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করতে ‘ফস্টার কেয়ার’ বা বিকল্প পারিবারিক যত্ন এবং সরকারি শিশু পরিবারে আবাসনের সুপারিশ করা হয়েছে। ফস্টার কেয়ার বা বিকল্প পারিবারিক যত্নের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, “নির্দিষ্ট বয়স বা সময়সীমা শেষে কারাবন্দী মায়ের সঙ্গে থাকা শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থে সমাজের নিকটাত্মীয়দের কাছে ‘ফস্টার কেয়ার’ বা বিকল্প পারিবারিক যত্নের আওতায় পুনর্বাসন করা যেতে পারে।”

অন্যদিকে, সরকারি শিশু পরিবারে আবাসনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “কোনো শিশুর ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয়দের কাছে পুনর্বাসনের সুযোগ না থাকলে বা তা শিশুর জন্য নিরাপদ না হলে ওই শিশুর জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন ‘সরকারি শিশু পরিবার’ বা উপযুক্ত নিরাপদ আবাসনকেন্দ্রে রেখে তার সার্বিক লালন–পালন ও শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যেতে পারে।”