কারাগারে বন্দী মায়েদের সঙ্গে থাকা শিশুরা কোনো অপরাধ করেনি। কিন্তু মায়ের বন্দিত্বের কারণে তাদের এমন এক পরিবেশে জীবন কাটাতে হচ্ছে, যা তাদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য মোটেও অনুকূল নয়। বর্তমানে প্রায় তিন শ শিশুর এই করুণ বাস্তবতা কেবল কারা ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্ব পালনের এক বড় পরীক্ষা।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রাপ্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দী মায়েদের সঙ্গে বর্তমানে ২৯৮ থেকে ৩০৩ জন শিশু অবস্থান করছে। তাদের জন্য খেলনা, পোশাক এবং পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে একটি শিশুর বেড়ে ওঠার সামগ্রিক চাহিদা কেবল এসব বস্তুগত সামগ্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। শিশুর প্রকৃত প্রয়োজন হলো নিরাপদ পরিবেশে খেলাধুলা করা, সমবয়সী অন্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশা, নতুন কিছু শেখার সুযোগ এবং একটি স্নেহময় পরিবেশ। কারাগারের চার দেয়ালের মাঝে এই মৌলিক চাহিদাগুলো কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদন এবং উচ্চ আদালতে রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বর্তমানে কারাগারে বন্দী মায়েদের সঙ্গে থাকা শিশুদের সঠিক সংখ্যা, তাদের বয়স এবং সার্বিক অবস্থা জানতে চেয়েছেন। আদালতের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে কেবল আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করলেই হবে না, বরং প্রতিটি শিশুর বাস্তব অবস্থার দৃশ্যমান উন্নতি ঘটাতে হবে। প্রতিবেদনে শিশুদের সংখ্যার যে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে, তা কেন হয়েছে তা পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কারণ বয়স, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, বিকাশ এবং পারিবারিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া তাদের জন্য যথাযথ সহায়তা পরিকল্পনা করা কঠিন। যতক্ষণ পর্যন্ত শিশুরা কারাগারে অবস্থান করবে, ততক্ষণ তাদের জন্য আলাদা, পরিচ্ছন্ন এবং শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এর পাশাপাশি বয়সোপযোগী খাবার, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় টিকা, খেলার জায়গা এবং প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
সমাজসেবা অধিদপ্তর বিকল্প পারিবারিক যত্ন এবং সরকারি শিশু পরিবারে আবাসনের সুপারিশ করেছে। তবে মায়ের কাছ থেকে শিশুকে সরিয়ে নেওয়াকেই সব ক্ষেত্রে একমাত্র সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। বিশেষ করে খুব অল্প বয়সী শিশুদের জন্য মায়ের সান্নিধ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারাগারের প্রতিকূল পরিবেশ থেকে রক্ষা করতে গিয়ে যেন শিশুকে আকস্মিক বিচ্ছেদের মানসিক যন্ত্রণার মুখে ঠেলে দেওয়া না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
প্রতিটি শিশুর পরিস্থিতি আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে মায়ের মতামত, শিশুর বয়স ও বিশেষ প্রয়োজন, সম্ভাব্য অভিভাবকের সক্ষমতা এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কেবল নিকটাত্মীয় আছে বলেই শিশুটি সেখানে নিরাপদ থাকবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই যে পরিবার দায়িত্ব নিতে ইচ্ছুক, তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান এবং নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে।
বিকল্প পরিবারে রাখার ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির সঙ্গে স্পষ্ট বোঝাপড়া, শিশুর প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগের সুব্যবস্থা থাকতে হবে। শিশুটি যথাযথ খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও স্নেহ পাচ্ছে কি না, তা প্রবেশন কর্মকর্তাদের নিয়মিত যাচাই করতে হবে। যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তবে দ্রুত নিরাপদ বিকল্প ব্যবস্থার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। পাশাপাশি শিশুর সাথে মায়ের নিয়মিত দেখা ও যোগাযোগের সুযোগ রাখতে হবে। সর্বোপরি, মায়ের মুক্তির পর তাদের পুনর্মিলনের প্রস্তুতিও পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত থাকা দরকার।