অনেকেরই ধারণা থাকে যে, নোবেল পুরস্কার পাওয়ার খবরটি মানুষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বা গম্ভীর কোনো মুহূর্তে পেয়ে থাকেন। আমার মতো অনেকেরই হয়তো মনে হতে পারে, একজন বিজ্ঞানী হয়তো গবেষণাগারে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে কোনো জটিল গবেষণা করছেন, কিংবা একজন লেখক হয়তো কোনো এক মহৎ উপন্যাস লিখছেন বা এমন কোনো বই পড়ছেন যার নাম বেশ ঢোলঢাক পিটিয়ে বলা যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর চারপাশে বইপত্রের স্তূপ, আর হঠাৎ সুইডেন থেকে ফোন এল, ‘অভিনন্দন, আপনি নোবেল পেয়েছেন।’

তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে অন্য কথা। অদ্ভুতভাবে লক্ষ্য করা যায় যে, নোবেল পাওয়ার খবরের সাথে তথাকথিত 'নোবেলসুলভ' পরিবেশের সম্পর্ক খুবই সামান্য।

২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল জয় করা কানাডার লেখক অ্যান কারসন যখন এই খবরটি পান, তখন তিনি রেইকিয়াভিক শহরের নিজের রান্নাঘরের মেঝে ঝাড়ু দিচ্ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই তাঁর কাছে নোবেল পাওয়ার সংবাদটি পৌঁছায়। সাহিত্যের ইতিহাসে এমন এক অদ্ভুত মুহূর্ত তৈরি হলো—এক হাতে ঝাড়ু, আর অন্য হাতে নোবেল।

রসায়নে এ বছর নোবেল পাওয়া জাপানের বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই তখন বাড়ির কাছের বাজারে গিয়েছিলেন। বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে তিনি ভাবছিলেন কী কী কেনা প্রয়োজন। তাঁর চিন্তায় ছিল, মিষ্টিকুমড়ো কিনলে সাথে চিংড়ি মাছ, বিশেষ করে কুচো চিংড়ি কিনতে হবে। ঠিক সেই সময়েই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে খবর যে, এই মানুষটি নোবেল পেয়েছেন!

২০০৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পাওয়া মার্কিন বিজ্ঞানী ফ্র্যাঙ্ক উইলচেক তখন গোসল করছিলেন। তাঁর স্ত্রী এসে তাঁকে জানান, ‘সুইডেন থেকে ফোন এসেছে।’ তিনি যখন গোসল শেষ করে বের হলেন, তখন তাঁর পুরো গা ভেজা। নোবেল পাওয়ার খবর শোনার জন্য এর চেয়ে ব্যক্তিগত মুহূর্ত সম্ভবত আর হয় না।

ব্রিটিশ লেখক ডরিস লেসিং ২০০৭ সালে সাহিত্যে নোবেল পান। তিনি বাজার করে বাড়ি ফিরছিলেন এবং বাড়ির সামনে এসে দেখেন সেখানে এক তুলকালাম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সাংবাদিকদের ভিড় জমেছে। তিনি তখনো বুঝতে পারেননি আসলে কী ঘটেছে। তখন সাংবাদিকরাই তাঁকে জানালেন, ‘আপনি নোবেল পেয়েছেন।’

২০১৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল জয়ী ব্রিটিশ বিজ্ঞানী পিটার হিগস তখন লাঞ্চ করতে বেরিয়েছিলেন। তাঁর সাথে ছিল না কোনো মুঠোফোন, ছিল না কম্পিউটার, ফলে ই-মেইল দেখার সুযোগও ছিল না। নোবেল ঘোষণার পর সবাই যখন তাঁকে খুঁজছিল, তিনি তখন নিখোঁজ। অনেকে ভেবেছিলেন তিনি হয়তো কোথাও পালিয়ে গেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত এক প্রতিবেশী তাঁকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে খবরটি দিয়ে তাঁর খোঁজ মেলান।

২০১৯ সালে রসায়নে নোবেল পাওয়া মার্কিন বিজ্ঞানী জন গুডএনাফ তখন দাঁত ব্রাশ করছিলেন। নোবেল কমিটির ফোনটি তিনি ধরতে পারেননি। পরবর্তীতে অন্য একজনের ফোনের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির জন্য তিনি নোবেল পেয়েছেন। আর সেই মুহূর্তে তাঁর হাতে ছিল টুথব্রাশ।

নোবেল পাওয়ার খবরের আরও অনেক বৈচিত্র্যময় গল্প রয়েছে। কেউ হয়তো ঘুমাচ্ছিলেন, কেউ গাড়ি চালাচ্ছিলেন, কেউ লাঞ্চ করছিলেন, কেউ বাজার করছিলেন, কেউ গোসল করছিলেন কিংবা কেউ দাঁত মাজছিলেন। আবার কেউ কেউ এমনভাবে ফোন বন্ধ করে রেখেছিলেন যে তাঁদের খুঁজে বের করতে প্রতিবেশীদের সাহায্য নিতে হয়েছে।

২০১৪ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পাওয়া নরওয়ের বিজ্ঞানী এডভার্ড মোজার তখন বিমানে বসে ম্যানুস্ক্রিপ্ট লিখছিলেন। মিউনিখ বিমানবন্দরে নামার পর একজন ব্যক্তি ফুল নিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানান এবং জানান যে মোজার কোনো একটি পুরস্কার পেয়েছেন। পরবর্তীতে ফোনের মেসেজ দেখার পর মোজার বুঝতে পারেন যে সেই পুরস্কারটি ছিল নোবেল।

২০২০ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পাওয়া মার্কিন অর্থনীতিবিদ পল মিলগ্রম তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। নোবেল কমিটি ফোন করেও তাঁর সাথে যোগাযোগ করতে পারছিল না। শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রতিবেশী এবং সহ-নোবেলজয়ী রবার্ট উইলসন রাস্তা পার হয়ে তাঁর বাড়িতে যান। দরজায় বেল বাজিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনি নোবেল পেয়েছেন। আপনার আরামের ঘুম ভাঙানোর জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’

নোবেল পাওয়ার খবরের আরও অনেক গল্প আছে। কেউ ঘুমাচ্ছেন। কেউ গাড়ি চালাচ্ছেন। কেউ লাঞ্চ করছেন। কেউ বাজার করছেন। কেউ গোসল করছেন। কেউ দাঁত মাজছেন। কেউ আবার এমনভাবে ফোন বন্ধ করে রেখেছেন যে তাঁকে খুঁজতে প্রতিবেশীকেই বের হতে হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, নোবেল পাওয়ার সময় সেজেগুজে টেলিফোন সেট হাতে বসে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। আপনি যদি নোবেল পাওয়ার যোগ্য হন, তবে নোবেল কমিটি আপনাকে ঠিক খুঁজে নেবে। যদি আপনাকে সরাসরি খুঁজে না পাওয়া যায়, তবে আপনার আশেপাশে থাকা পরিচিত কারো মাধ্যমে খবরটি পৌঁছে দেওয়া হবে। তাই বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার চিন্তা না করে শুধু মন দিয়ে নিজের কাজ করে যাওয়াই শ্রেয়।