আট বছর আগে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ৭০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন লক্ষ্মীপুরে ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা আবদুর রহমান বিপ্লব। এই অভিযোগের তির লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লোকমান হোসাইনের দিকে। এ ঘটনায় তিনি তৎকালীন ওই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করার ঘোষণা দিয়েছেন এবং তাঁর দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন।

আজ সোমবার লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান আবদুর রহমান বিপ্লব। তিনি লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সাবেক সেক্রেটারি এবং পৌর শহরের বাঞ্ছানগর এলাকার বাসিন্দা।

সংবাদ সম্মেলনে বিপ্লব বিস্তারিত বর্ণনা করেন যে, ২০১৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে তৎকালীন ওসি লোকমান হোসাইনের নির্দেশে পুলিশ তাঁর বাসায় অভিযান চালায় এবং দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। অভিযোগ অনুযায়ী, পুলিশ তাঁর ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে এবং তাঁর চোখ বেঁধে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যায়। এরপর তাঁকে থানার এলাকায় ওসির বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে দুই হাত বেঁধে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়। তিনি দাবি করেন, সারাদিন এভাবে ঝুলিয়ে রাখার পর রাতে তাঁকে মোটা লাঠি দিয়ে প্রচণ্ড মারধর করা হয় এবং ওই সময়ে তাঁকে কোনো খাবার দেওয়া হয়নি।

বিপ্লবের ভাষ্যমতে, রাত প্রায় ১১টার দিকে তৎকালীন জেলা পুলিশ সুপার আ স ম মাহাতাব উদ্দিন সেখানে উপস্থিত হলে তাঁকে ঝুলন্ত অবস্থা থেকে নামানো হয়। এরপর ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তাঁকে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।

অভিযোগের ধারাবাহিকতায় বিপ্লব জানান, গভীর রাতে পুলিশ তাঁকে গাড়িতে করে রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার বেড়িবাঁধ এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে তাঁকে পুনরায় মারধর করা হয় এবং হত্যার ভয় দেখিয়ে তাঁর শেষ ইচ্ছার কথা জানতে চাওয়া হয়। এরপর তাঁকে রামগতি থানায় নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করা হয় এবং তাঁর শরীরে ইনজেকশন পুশ করা হয়। পরবর্তীতে তাঁকে যখন লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানায় ফিরিয়ে আনা হয়, তখন তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।

সংবাদ সম্মেলনে আবদুর রহমান বিপ্লব বলেন, ‘আমাকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ওসি লোকমান আমার বাবার কাছে এক কোটি টাকা দাবি করেন। ছেলেকে হারানোর ভয়ে বাবা দেনদরবারের পর ৭০ লাখ টাকা দিতে রাজি হন। আমি অসুস্থ হয়ে পড়লে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ সময় আমার বাবার কাছ থেকে চাপ প্রয়োগ করে ৭০ লাখ টাকা নেওয়া হয়।’

বিপ্লব আরও অভিযোগ করেন, পরবর্তীতে তাঁকে আটটি ভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। এর মধ্যে দুটি মামলায় পুলিশ তাঁর ২০ দিনের রিমান্ড চেয়েছিল, তবে আদালত সেই আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে সরাসরি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও দাবি করেন, ২০১৬ সালে রায়পুর থানার দায়িত্বে থাকাকালীন ওসি লোকমান হোসাইন রায়পুর পৌর জামায়াতের নায়েবে আমির কামাল উদ্দিনের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা এবং রায়পুর পৌর ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ইমরান হোসেন পরানের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা আদায় করেছিলেন। তাঁদের মারধর করে টাকা নেওয়ার পর মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছিল বলেও তিনি জানান।

বিপ্লবের অভিযোগ, তৎকালীন সরকারের আমলে লক্ষ্মীপুরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছিলেন ওসি লোকমান হোসাইন। বর্তমানে তিনি পুলিশের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) উত্তরায় কর্মরত আছেন বলে জানান বিপ্লব। এসব গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি লোকমান হোসাইনের বিরুদ্ধে মামলা করার ঘোষণা দিয়েছেন।

এই সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে লক্ষ্মীপুর সদর থানার সাবেক ওসি লোকমান হোসাইন মুক্তকণ্ঠকে মুঠোফোনে বলেন, ‘ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে ৭০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। অনেক আগের ঘটনা, যতটুকু মনে পড়ে, ডিবি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশে দিয়েছিল। আমি তাকে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছি। নির্যাতনের অভিযোগও সঠিক নয়।’