যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা (১১তম গ্রেড) পদের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার, ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন প্রশ্নপত্রে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে এই ঘটনাকে কেউ কেউ ‘বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতার প্রতিফলন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এমনকি ক্ষমতাসীন বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও এই ঘটনাকে ‘অমার্জনীয় অপরাধ’ বলে এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।

আজ শনিবার বেলা ১১টার দিকে পরীক্ষা শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের এই নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র বিতরণের সময় শিক্ষকেরা পরীক্ষার্থীদের জানান যে, প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার কারণেই এই স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে চাকরিপ্রত্যাশীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এবং শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা স্থগিতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এনসিপি। দলটির দপ্তর সেলের পক্ষ থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, পরীক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর আগের রাত থেকেই ছড়িয়ে পড়েছিল। তা সত্ত্বেও বহু প্রার্থী দূর-দূরান্ত থেকে যাতায়াত, থাকা-খাওয়া এবং প্রস্তুতির পেছনে প্রচুর অর্থ, সময় ও শ্রম ব্যয় করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছান। কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর তাঁরা স্থগিতের ঘোষণা পান, যা তাঁদের আর্থিক ক্ষতি, মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

এনসিপি আরও প্রশ্ন তুলেছে যে, প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথাসময়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না এবং অভিযোগ সামনে আসার পরও কেন প্রার্থীদের কেন্দ্রে পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো—এর স্পষ্ট জবাব দিতে হবে। প্রশ্নপত্র কীভাবে বাইরে গেল, এর সঙ্গে কারা জড়িত এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়ে দায়িত্বে অবহেলা বা যোগসাজশ ছিল কি না—তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রমাণের ভিত্তিতে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেছেন, “প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে পরীক্ষার্থীদের যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা সরকারকে পূরণ করতে হবে।”

বিএনপি সরকার এই ঘটনার দায় এড়াতে পারে না উল্লেখ করে ইসলামী আন্দোলন আরও বলেছে, এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সিন্ডিকেট নির্মূল, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত বিচার করতে হবে। অন্যথায় রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থার প্রতি তরুণদের আস্থা আরও গভীর সংকটে পড়বে বলে তাঁরা সতর্ক করেছেন।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের নিন্দা জানিয়ে এবং দ্রুততম সময়ে নতুন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার দাবি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ছাত্রদল। বিবৃতিতে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন বলেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

ছাত্রদল তাদের বিবৃতিতে আরও বলেছে, ‘পরিকল্পিতভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী ফ্যাসিবাদের দোসরদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই নিয়োগ পরীক্ষার নতুন তারিখ ঘোষণা করতে হবে। ভবিষ্যতে যেকোনো উপায়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করতে হবে।’

জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ চার দফা দাবি জানিয়েছেন। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অব্যাহতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের যাতায়াত ব্যয় বিবেচনায় উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান।

বিএনপির জোটসঙ্গী গণসংহতি আন্দোলনের যুব সংগঠন যুব ফেডারেশনের আহ্বায়ক গোলাম মোস্তফা ও সদস্যসচিব জাহিদ সুজন এক বিবৃতিতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষী ব্যক্তিদের বিচার ও ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, এনসিপির যুব সংগঠন জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি তারিকুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক ফারহাদ সোহেল প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পরীক্ষার নতুন তারিখ ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছেন। এনসিপির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তি এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে ‘বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতার প্রতিফলন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।