পাঁচটি করবর্ষের বিপরীতে প্রদেয় ৬৬৬ কোটি টাকা কর দাবির বিষয়ে কর কমিশনারের সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গ্রামীণ কল্যাণের করা দুটি পৃথক রিট আবেদন খারিজ (রুল ডিসচার্জ) করেছেন হাইকোর্ট। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশিত হয়েছে। সোমবার প্রকাশিত এই দুটি রায়ের মধ্যে একটি ১৫ পৃষ্ঠার এবং অন্যটি ৩২ পৃষ্ঠার। গত ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন।
৩২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের শেষ অংশে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, আইন অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব রিট আবেদনকারী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে বকেয়া কর আদায়ের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এই নির্দেশের আওতায় ঢাকার সংশ্লিষ্ট কর কমিশনারসহ সকল বিবাদীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ১৫ পৃষ্ঠার রায়ে বকেয়া কর সংক্রান্ত বিষয়ে নোটিশ জারির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, গ্রামীণ কল্যাণের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
মূলত ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭—এই পাঁচটি করবর্ষের জন্য কর কর্তৃপক্ষের করা দাবির বিরুদ্ধে গ্রামীণ কল্যাণ ওই দুটি রিট আবেদন করেছিল।
আইনজীবীদের সূত্রে জানা গেছে, গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল, যার আওতায় গ্রামীণ ফোনে বিনিয়োগ করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, শেয়ার থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশের ওপর অর্জিত মুনাফার ৪২ দশমিক ৬৫ শতাংশ পাওয়ার কথা ছিল গ্রামীণ কল্যাণের। গ্রামীণ টেলিকমের মাধ্যমে এই লভ্যাংশ গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এই আয়ের প্রকৃতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। কর কর্তৃপক্ষের দাবি, এই অর্থ লভ্যাংশ আয় নয়, বরং এটি বিনিয়োগের ওপর প্রাপ্ত আয় বা সুদ, যা ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়’ হিসেবে গণ্য হবে।
এর আগে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ রিট দুটি খারিজ করে রায় দিয়েছিলেন। তবে ২৯ আগস্ট ওই বেঞ্চ নিজেদের রায় প্রত্যাহার করে নেন। কারণ হিসেবে জানানো হয়, ওই বেঞ্চের দ্বিতীয় বিচারক এক সময় সরকারপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে এই মামলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, যার ফলে রায়টি ত্রুটিপূর্ণ বা ‘ডিফেকটিভ’ হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয় এবং তিনি ১৩ মে এক আদেশে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন দ্বৈত বেঞ্চে প্রেরণ করেন। এরপর শুনানির পর বর্তমান রায়টি আসে।
আদালতে গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষে শুনানি পরিচালনা করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফিদা এম কামাল, আবদুল্লাহ আল মামুন ও সরদার জিন্নাত আলী। রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আবদুস সামাদ আজাদ।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আবদুস সামাদ আজাদ জানান, চুক্তি অনুযায়ী গ্রামীণ কল্যাণ থেকে গ্রামীণ টেলিকম কিছু অর্থ বিনিয়োগ, ঋণ বা আর্থিক সহায়তা হিসেবে গ্রহণ করে। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “চুক্তি অনুসারে ওই অর্থ ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়। এর বিপরীতে অর্জিত মুনাফার ৪২ দশমিক ৬৫ শতাংশ পাবে গ্রামীণ কল্যাণ। এ ক্ষেত্রে কার ওপর কর আরোপ হবে এবং কী হারে কর আরোপ হবে তা নিয়েই মূলত রিটগুলো। দুটি আলাদা প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি আইনে দুটি কোম্পনি পৃথক আইনগত স্বত্ত্বা। তাই আয়করও পৃথকভাবে দিতে হবে।”
তিনি আরও জানান, আয়কর অধ্যাদেশের ১২০(১) ধারা অনুযায়ী উপকর কমিশনারের (ডিসিটি) ভুল আদেশ সংশোধনের ক্ষমতা পরিদর্শী অতিরিক্ত কর কমিশনারের রয়েছে। রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শুনানির জন্য আবেদনকারীকে যথাযথ নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। পরিদর্শী অতিরিক্ত কর কমিশনার সিদ্ধান্ত দেন যে, গ্রামীণ কল্যাণের দাবি করা ডিভিডেন্ড ইনকাম আসলে ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়’। ২০১৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরের ওই সিদ্ধান্ত যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখিয়ে নিষ্পত্তি করা হয়। রায়ে বলা হয়েছে, গ্রামীণফোনে বিনিয়োগের সূত্রে আয়ের ৪২ দশমিক ৬৫ শতাংশ অংশ হিসেবে প্রাপ্ত মুনাফা লভ্যাংশ নয়, বরং অন্যান্য উৎস থেকে আয়।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আরও বলা হয়েছে, ওই আয়ের বিপরীতে গ্রামীণ টেলিকমের কাছ থেকে উৎসে কর কাটা হয়নি এবং সরকারি কোষাগারে কর জমা দেওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, আয়কে ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়’ হিসেবে গণ্য করে কর নির্ধারণের সিদ্ধান্তটি বেআইনি নয়, তাই অধ্যাদেশের ১২০ ধারার কার্যক্রম বৈধ। পরবর্তীতে গ্রামীণ কল্যাণ রিভিশন আবেদন করলেও আয়কর অধ্যাদেশের ১২১এ(৪)(খ) ধারার শর্ত অনুযায়ী স্বীকৃত করদায় পরিশোধ না করায় তাদের আবেদন খারিজ হয়ে যায়। এই সব কারণেই হাইকোর্ট রুল ডিসচার্জ করেছেন।
মোহাম্মদ আবদুস সামাদ আজাদ জানান, রায়ের প্রত্যায়িত অনুলিপি পাওয়ার পর উপ করকমিশনার পাঁচটি করবর্ষের বকেয়া ৬৬৬ কোটি টাকা আদায়ের জন্য আইন অনুযায়ী নোটিশ ইস্যু করবেন। তিনি বলেন, হাইকোর্টের রায় অনুসারে যত দ্রুত সম্ভব এই নোটিশ ইস্যু করতে হবে।
অন্যদিকে, গ্রামীণ কল্যাণের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, হাইকোর্টের রায়ের পর তা স্থগিত চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “রায়ের প্রত্যায়িত অনুলিপির জন্য আবেদন করা আছে। এখন প্রত্যায়িত অনুলিপি পেয়ে লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) দায়ের করা হবে।”
তিনি আরও জানান, গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের চুক্তির মাধ্যমে গ্রামীণফোনের শেয়ার কেনা হয়েছিল। অর্থ দিয়েছিল গ্রামীণ কল্যাণ এবং পরিচালনার দায়িত্ব ছিল গ্রামীণ টেলিকমের। ২০০৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত লভ্যাংশ ভাগাভাগির এই প্রক্রিয়া চলছিল, যা কর কমিশনও অনুমোদন করেছিল। লভ্যাংশের বিপরীতে গ্রামীণ ফোনই অগ্রিম কর কেটে নিয়েছিল। ২০১৭ সালে কর কর্তৃপক্ষ পরিদর্শন করে একে ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়’ বলে ঘোষণা করে এবং কর দাবি করে। আইনজীবীর দাবি, যেহেতু কর ইতিমধ্যে দেওয়া হয়েছে, তাই পুনরায় কর দাবি করা মানে ‘ডাবল ট্যাক্সসেশন’, আর এই যুক্তিতেই রিট করা হয়েছিল।