করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি করা হলেও নতুন করধাপ, বিনিয়োগ রেয়াতের পরিমাণ হ্রাস, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার কর আদায়ের পরিবর্তিত পদ্ধতি এবং ন্যূনতম করের নতুন নিয়মের কারণে অনেক করদাতার করের বোঝা বাড়ছে। এই নিবন্ধে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে কীভাবে একই আয় ও বিনিয়োগ থাকা সত্ত্বেও করের অঙ্কে পরিবর্তন আসতে পারে। পাশাপাশি রিটার্ন জমার সময়ের ওপর ভিত্তি করে ছাড় ও বাড়তি করের হিসাবও আলোচনা করা হয়েছে।

বর্তমানে আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় চলছে। অনেক করদাতা লক্ষ্য করছেন যে, আগের বছরের তুলনায় এবার তাঁদের করের পরিমাণ বেড়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাঁদের বার্ষিক আয় এবং বিনিয়োগের পরিমাণ একই থাকা সত্ত্বেও এই বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, যদিও এবারের বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হয়েছে।

অর্থ আইন ২০২৬-এর মাধ্যমে ব্যক্তিশ্রেণির আয়করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। এনবিআরের আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২৭-এ নতুন করধাপ, বিনিয়োগ রেয়াত, ন্যূনতম কর এবং রিটার্ন দাখিলের সময় অনুযায়ী প্রণোদনা ও বাড়তি করের নিয়মাবলি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পূর্ববর্তী করবর্ষের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, এই নতুন নিয়মগুলোর প্রভাবে অনেক করদাতার করের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

সাধারণ করদাতাদের জন্য করযোগ্য আয় ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে এবার কোনো কর দিতে হবে না। ৪ লাখ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ক্ষেত্রে করধাপের হিসাবে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। তবে করযোগ্য আয় ৭ লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেলেই করের পরিমাণ বাড়তে শুরু করে। এর সাথে বিনিয়োগ রেয়াত হ্রাস, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার করপদ্ধতির পরিবর্তন এবং সারা দেশে ন্যূনতম কর ৫ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রভাব যুক্ত হয়েছে।

এখানে উল্লেখ্য যে, করযোগ্য আয় বলতে মোট আয়কে বোঝানো হচ্ছে না। আইন অনুযায়ী মোট আয় থেকে করমুক্ত সুবিধা এবং অনুমোদিত ছাড় বাদ দেওয়ার পর যে অবশিষ্ট আয় থাকে, তাকেই করযোগ্য আয় বলা হয়। ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়কালটি হলো আয়বর্ষ। এই সময়ের আয় ও বিনিয়োগের ভিত্তিতে ২০২৬-২৭ করবর্ষে কর নির্ধারণ এবং রিটার্ন জমা দেওয়া হচ্ছে।

নতুন বিনিয়োগ রেয়াতের নিয়ম ২০২৬-২৭ করবর্ষ থেকে কার্যকর করা হয়েছে। তবে অর্থ আইনটি আয়বর্ষের শেষ দিনে প্রণয়ন করায় করদাতারা বিনিয়োগের সময় নতুন নিয়মগুলো জানার সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গত করবর্ষে সাধারণ করদাতাদের প্রথম সাড়ে ৩ লাখ টাকা করমুক্ত ছিল এবং পরবর্তী ১ লাখ টাকার ওপর করের হার ছিল ৫ শতাংশ। এরপর পর্যায়ক্রমে ১০, ১৫, ২০, ২৫ ও ৩০ শতাংশ হারে কর দিতে হতো। এবার করমুক্ত সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হলেও, এর পরবর্তী আয়ের ওপর সরাসরি ১০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়েছে। অর্থাৎ, আগের ৫ শতাংশের করধাপটি পুরোপুরি তুলে দেওয়া হয়েছে। নতুন নিয়মে প্রথম ৪ লাখ টাকা করমুক্ত, পরবর্তী ৩ লাখ টাকায় ১০ শতাংশ, পরের ৪ লাখে ১৫ শতাংশ, পরের ৫ লাখে ২০ শতাংশ, পরের ২০ লাখে ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ কর দিতে হবে।

বিনিয়োগ রেয়াত, ন্যূনতম কর ও সারচার্জ বাদ দিলে একই করযোগ্য আয়ে করের তুলনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, করমুক্ত সীমা বাড়ানোর সুবিধা মূলত কম আয়ের করদাতারা পেয়েছেন। যাদের করযোগ্য আয় ৭ লাখ টাকার বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রে নতুন করধাপের কারণে কর বাড়ছে।

কর বৃদ্ধির আরেকটি প্রধান কারণ হলো বিনিয়োগ রেয়াত কমানো। গতবার তিনটি হিসাবের মধ্যে সর্বনিম্ন অঙ্কটি রেয়াত হিসেবে পাওয়া যেত। হিসাব তিনটি ছিল— বিশেষ কিছু আয় বাদ দেওয়ার পর মোট আয়ের ৩ শতাংশ, অনুমোদিত বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা। এবারও মোট আয়ের ৩ শতাংশের শর্তটি বহাল থাকলেও, অনুমোদিত বিনিয়োগের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এছাড়া সর্বোচ্চ রেয়াতের সীমা ১০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ লাখ টাকা করা হয়েছে। ফলে একই পরিমাণ বিনিয়োগ করেও করদাতারা এবার কম রেয়াত পাবেন।

উদাহরণস্বরূপ, একজন সাধারণ করদাতার করযোগ্য আয় ১০ লাখ টাকা এবং অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগ ২ লাখ টাকা হলে, গতবার তাঁর মূল কর ছিল ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা। বিনিয়োগ রেয়াত ৩০ হাজার টাকা পাওয়ার পর নিট কর হয়েছিল ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা। এবার তাঁর মূল কর হবে ৭৫ হাজার টাকা এবং বিনিয়োগ রেয়াত হবে ২০ হাজার টাকা। ফলে নিট কর দাঁড়াবে ৫৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ, আয় ও বিনিয়োগ একই থাকা সত্ত্বেও কর বাড়বে ১৭ হাজার ৫০০ টাকা, যা প্রায় ৪৭ শতাংশ বৃদ্ধি। এর মধ্যে করধাপ পরিবর্তনের কারণে কর বেড়েছে ৭ হাজার ৫০০ টাকা এবং বিনিয়োগ রেয়াত কমার কারণে বেড়েছে আরও ১০ হাজার টাকা।

উচ্চ আয়ের করদাতাদের ওপরও এই নিয়মের প্রভাব পড়বে। কারণ, বিনিয়োগের পরিমাণ যাই হোক না কেন, সর্বোচ্চ সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি রেয়াত পাওয়া যাবে না। ধরা যাক, একজন করদাতার করযোগ্য আয় সাড়ে ৩ কোটি টাকা এবং অনুমোদিত বিনিয়োগ ১ কোটি টাকা। আগের নিয়মে তিনি সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা রেয়াত পেতেন, কিন্তু এবার পাবেন সর্বোচ্চ সাড়ে ৭ লাখ টাকা। শুধুমাত্র এই সর্বোচ্চ সীমা কমার কারণে তাঁর কর ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বাড়তে পারে।

সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ক্ষেত্রেও নিয়ম বদলেছে। আগে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে উৎসে কাটা করই সাধারণত চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য হতো এবং রিটার্নে মুনাফা দেখালেও তা অন্য আয়ের সাথে যোগ করে পুনরায় সাধারণ করহারে হিসাব করতে হতো না। এবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফা মোট আয়ের সাথে যোগ করতে হবে। মুনাফা থেকে আগে যে কর কাটা হয়েছে, তা মোট কর থেকে বাদ যাবে। ফলে করদাতার প্রযোজ্য করহারের ওপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত কর দিতে হতে পারে। যদি করদাতার আয় উচ্চ করহারের আওতায় পড়ে, তবে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কেটে রাখা উৎস কর বাদ দেওয়ার পর বাড়তি কর আরোপ হবে।

ধরা যাক, একজন করদাতা সঞ্চয়পত্র থেকে ১ লাখ টাকা মুনাফা পেয়েছেন এবং ১০ শতাংশ হারে ১০ হাজার টাকা কর কাটা হয়েছে। পুরো ১ লাখ টাকা একই করধাপের মধ্যে পড়লে এই হিসাব প্রযোজ্য হবে, অন্যথায় হিসাব বদলে যাবে। কম আয়ের করদাতারা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কর কাটা হলে তা ফেরত চাইতে পারবেন, তবে উচ্চ আয়ের সঞ্চয়পত্রধারীদের রিটার্ন দেওয়ার সময় বাড়তি কর দিতে হতে পারে।

এছাড়া, করমুক্ত সীমার বেশি আয় হলে এখন সারা দেশে ন্যূনতম ৫ হাজার টাকা কর দিতে হবে। হিসাব অনুযায়ী কর ৫ হাজার টাকার কম হলেও সাধারণ করদাতাকে ৫ হাজার টাকাই দিতে হবে। তবে নতুন করদাতাদের জন্য ন্যূনতম কর ১ হাজার টাকা। গতবার ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে ন্যূনতম কর ছিল ৫ হাজার টাকা, অন্য সিটি করপোরেশনে ৪ হাজার এবং সিটি করপোরেশনের বাইরে ৩ হাজার টাকা। ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ন্যূনতম কর বাড়েনি, তবে অন্য সিটি করপোরেশনে ১ হাজার এবং সিটি করপোরেশনের বাইরে ২ হাজার টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, সিটি করপোরেশনের বাইরের একজন পুরোনো করদাতার হিসাব করা কর ৩ হাজার টাকা হলে, গতবার তিনি ৩ হাজার টাকাই দিতেন, কিন্তু এবার তাঁকে ৫ হাজার টাকা দিতে হবে। এনবিআরের নির্দেশিকার একটি উদাহরণে দেখা গেছে, একজন নতুন করদাতার কর রেয়াতের পর শূন্যের নিচে নেমে গেলেও তাঁকে ১ হাজার টাকা ন্যূনতম কর দিতে হয়েছে। তিনি পুরোনো করদাতা হলে এই ন্যূনতম কর হতো ৫ হাজার টাকা।

৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে পরিশোধযোগ্য করের ওপর ৫ শতাংশ প্রণোদনা পাওয়ার সুযোগ ছিল, যার সর্বোচ্চ সীমা ২৫ হাজার টাকা। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দিলে বাড়তি কর দিতে হবে না, তবে ৫ শতাংশ প্রণোদনাও পাওয়া যাবে না। এনবিআরের নির্দেশিকায় আবদুর রউফ নামের একজন করদাতার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগ রেয়াত বাদ দেওয়ার পর তাঁর কর দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৮০০ টাকা। তিনি ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দিলে ১ হাজার ২৯০ টাকা প্রণোদনা পেতেন এবং পরিশোধ করতে হতো ২৪ হাজার ৫১০ টাকা। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দিলে তাঁকে পুরো ২৫ হাজার ৮০০ টাকাই দিতে হবে।

জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে রিটার্ন দিলে কমপক্ষে ৩ হাজার টাকা বাড়তি কর দিতে হবে, ফলে তাঁর মোট কর হবে ২৮ হাজার ৮০০ টাকা। এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে রিটার্ন দিলে বাড়তি কর হবে কমপক্ষে ৫ হাজার টাকা, অর্থাৎ মোট কর হবে ৩০ হাজার ৮০০ টাকা। এর অর্থ, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত করহার বৃদ্ধি না ঘটলেও, সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দেওয়া ব্যক্তির তুলনায় তিনি ১ হাজার ২৯০ টাকার সুবিধা হারাবেন।

উল্লেখ্য, ৫ শতাংশ প্রণোদনা মোট করের ওপর দেওয়া হয়নি। উৎসে ও অগ্রিম কাটা কর বাদ দেওয়ার পর রিটার্নের সময় যে কর বাকি ছিল, তার ওপর প্রণোদনা হিসাব করা হয়েছে। চাকরিজীবী ও নিয়মিত করদাতাদের কর সাধারণত আগেই কেটে নেওয়া হয়, ফলে রিটার্নের সময় তাঁদের বাকি কর খুব কম বা শূন্য হতে পারে। এই কারণে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দিলেও তাঁরা মোট করের ওপর ৫ শতাংশ ছাড় পাননি। অন্যদিকে, যাদের কর আগে কাটা হয়নি, তারা রিটার্নের সময় পুরো কর পরিশোধ করে তুলনামূলক বেশি প্রণোদনা পেয়েছেন। এটি করহার বাড়ার বিষয় না হলেও, নিয়মিত ও অগ্রিম করদাতারা সমান সুবিধা পেয়েছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সাধারণ করদাতাদের করযোগ্য আয় ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত। নারী ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্য এই সীমা সাড়ে ৪ লাখ টাকা। তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য সীমা ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা। গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের গেজেটভুক্ত আহত যোদ্ধাদের করমুক্ত সীমা সাড়ে ৫ লাখ টাকা। নতুন করদাতাদের ন্যূনতম কর ১ হাজার টাকা। সঞ্চয়পত্রধারীর প্রযোজ্য করহার ১০ শতাংশ বা তার কম হলে আগে কাটা কর দিয়েই দায় মিটে যেতে পারে এবং প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কর কাটা হলে তা ফেরত চাওয়া যাবে।