‘জ্বর ছিল। আমার প্রেশার কমে যাচ্ছিল। পেটে ব্যথা। ডাক্তার বলেছিল, বাসায় থাকা ঠিক হবে না। কোনো হাসপাতালে সিট পাওয়া যায়নি। ভয় পাই। সবশেষে রাত দুটোর দিকে যক্ষ্মা হাসপাতাল থেকে জানাল, এখানে ভর্তি হওয়া যাবে।’
রাজধানীর চকবাজার এলাকার বাসিন্দা রহিমা ইসলাম তাঁর বর্তমান পরিস্থিতির কথাগুলোই বলছিলেন। গত বুধবার থেকে তিনি রাজধানীর শ্যামলী এলাকায় অবস্থিত ২৫০ শয্যার যক্ষ্মা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
উল্লেখ্য, এই হাসপাতালটি মূলত যক্ষ্মা চিকিৎসার জন্য একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। তবে এখানে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা করার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা ও ঝুঁকির সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, যক্ষ্মা এবং ডেঙ্গু—দুটি ভিন্ন রোগ হলেও দুটিই সংক্রামক প্রকৃতির।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত রোববার সারা দেশে মোট ৬ হাজার ৬৯ জন ডেঙ্গু রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল এবং মুগদা হাসপাতালের প্রতিটিতেই ২০০ জনের বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন।
রোগীর সংখ্যার তুলনায় শয্যার তীব্র সংকট থাকায় এসব হাসপাতালের মেঝেতে শুইয়ে রোগীর চিকিৎসা করতে হচ্ছে। রহিমা ইসলাম জানান, এই পরিস্থিতির কারণেই তিনি ওইসব হাসপাতালে যেতে আগ্রহী ছিলেন না।
যক্ষ্মা হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসার বিষয়টি প্রথম সামনে আসে প্রতিষ্ঠানটির উপপরিচালক আয়শা আখতারের মাধ্যমে। তিনি গতকাল মুক্তকণ্ঠকে জানান, বর্তমানে এই হাসপাতালে ছয়জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন।
যক্ষ্মা রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন কি না—মুক্তকণ্ঠের এমন প্রশ্নের জবাবে আয়শা আখতার বলেন, ‘না, এদের কারও যক্ষ্মা নেই। এরা ডেঙ্গুর রোগী। এই হাসপাতালে ১০টি বেড আছে ডেঙ্গু রোগীর জন্য।’
জানা গেছে, সরকার প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ১০টি করে শয্যা বরাদ্দ রাখার নির্দেশনা দিয়েছে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী যক্ষ্মা হাসপাতালের একটি কেবিন এবং একটি ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।
হাসপাতালের কেবিনে কথা হয় রহিমার সঙ্গে। তাঁর স্বামী স্বর্ণালংকারের বাক্স ও প্যাকেটের ব্যবসা করেন। এই দম্পতির তিন সন্তান রয়েছে, যার মধ্যে ছোট ছেলেটি বর্তমানে মায়ের সঙ্গে হাসপাতালে অবস্থান করছে।
রহিমাকে বাহ্যিকভাবে খুব বেশি অসুস্থ মনে হয় না; তাঁর কথা বলা এবং উচ্চারণ অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি জানান, ‘বেশ কিছুদিন ধরে জ্বর। কোনো দিন জ্বর ১০৬ পর্যন্ত। ডাক্তারের কথামতো ওষুধ খাই, জ্বর কমে, আবার হয়। সঙ্গে পেটে ব্যথা। প্রথমে পরীক্ষায় দেখা যায়, ফ্যাটি লিভার। জ্বর কমে না। আবার পরীক্ষা করে ডেঙ্গু ধরা পড়ে।’
গত বুধবার এলাকার পরিচিত একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পরামর্শ দেন যে, রহিমার শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয় এবং পেটে পানি জমেছে, তাই তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা প্রয়োজন। বাসায় রাখা নিরাপদ হবে না বলে তিনি সতর্ক করেন।
সেইদিন সন্ধ্যার পর রহিমার পরিবার তাঁকে হাসপাতালে ভর্তির চেষ্টা শুরু করে। কিন্তু কোনো হাসপাতালেই শয্যা পাওয়া যাচ্ছিল না। রহিমা বলেন, ‘যে হাসপাতালে ফোন করা হয়, তারা বলে ডেঙ্গু রোগীর জন্য সিট খালি নেই।’
তিনি একে একে প্রায় ১০টি হাসপাতালের নাম উল্লেখ করে জানান, সব জায়গাতেই ফোন করে ব্যর্থ হতে হয়েছে। অবশেষে দিবাগত রাত একটার দিকে একজন পরিচিত সাংবাদিক তাঁকে যক্ষ্মা হাসপাতালে খোঁজ নেওয়ার পরামর্শ দেন।
রহিমা বলেন, ‘আমার স্বামী হাসপাতালটির একটি নম্বরে ফোন করে। আমাদের জানানো হয়, ভর্তি হওয়া যাবে। রাত দুইটার পরে আমি এখানে আসি।’
কথোপকথনের মাঝে হাসপাতালের একজন কর্মচারী এসে রহিমাকে একটি মশারি দিয়ে যান এবং বলেন, ‘নতুন মশারি। ইনট্যাক্ট।’ এর উদ্দেশ্য ছিল রহিমাকে মশার কামড় থেকে রক্ষা করা এবং হাসপাতাল থেকে যেন ডেঙ্গু সংক্রমণ না ছড়ায়।
তবে এই বিষয়টি খটকা জাগায়। যক্ষ্মা ও ডেঙ্গু—দুটিই সংক্রামক রোগ। যক্ষ্মা চিকিৎসার বিশেষায়িত হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় কোনো ঝুঁকি আছে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে–নজির আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘যক্ষ্মা বাতাসে ছড়ায়। হাসপাতালে ওষুধপ্রতিরোধী যক্ষ্মা রোগী ভর্তি থাকেন। তাই একই কম্পাউন্ডে দুই ধরনের রোগী রাখা কিছুটা ঝুঁকির।’