জামালপুরের চরাঞ্চলের উর্বর মাটিতে শীতকালীন সবজি চাষে এখন চরম ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের পুরো সময় ব্যয় হচ্ছে জমি প্রস্তুত করা, বীজ বপন এবং চারা পরিচর্যার কাজে। তারা বর্তমানে টমেটো, বেগুন, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, করলা, ধুন্দুল, ফুলকপি ও বাঁধাকপিসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি আবাদ করছেন। তবে এই ব্যস্ততার মাঝেই কৃষকদের মনে গভীর দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সারের অপ্রতুলতা। তাদের অভিযোগ, চাহিদামতো সার না পাওয়ায় সবজি আবাদের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। যদিও কৃষি বিভাগের দাবি, জেলায় সারের কোনো সংকট নেই।
জামালপুর সদরসহ দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, বকশীগঞ্জ, মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী উপজেলার চরাঞ্চলগুলোতে এখন শীতকালীন সবজি চাষের ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। কোথাও কৃষকরা জমি তৈরি করছেন, কোথাও লাগানো হচ্ছে চারা। আবার অনেক জায়গায় বীজতলায় বেড়ে ওঠা চারার পরিচর্যায় তারা ব্যস্ত সময় পার করছেন।
কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এই জেলায় শীতকালীন সবজি আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ইতিমধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ সম্পন্ন হয়েছে। মৌসুমের শুরুতেই ভালো ফলন নিশ্চিত করতে জমির পরিচর্যায় বাড়তি সময় দিচ্ছেন কৃষকরা।
কৃষকদের মতে, আগাম সবজি চাষের ক্ষেত্রে জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে বীজ বপন, চারা রোপণ, সার প্রয়োগ, সেচ এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ—প্রতিটি ধাপেই অত্যন্ত বাড়তি যত্ন নিতে হয়। এর পাশাপাশি আবহাওয়ার অনিশ্চয়তাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অতিবৃষ্টির ফলে জমিতে পানি জমে চারা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আবার অতিরিক্ত গরমের কারণেও কিছু সবজির স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এই সব কারণে তাদের নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ করতে হচ্ছে।
ইসলামপুরের কৃষক রহিম এক বিঘা জমিতে সবজি চাষ করেছেন। জমিতে সার প্রয়োগের পাশাপাশি তিনি আগাছা পরিষ্কারের কাজ করছেন। রহিমের অভিযোগ, প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি মনে করেন, যতটুকু সার দরকার ততটুকু না পেলে গাছের সঠিক পরিচর্যা করা কঠিন হয়ে পড়ে। আগাম সবজি চাষে এমনিতেই অনেক পরিশ্রম করতে হয়, তার ওপর সারের দুশ্চিন্তা থাকলে উৎপাদন ভালো হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়।
আরেক কৃষক মোহাম্মদ আলী জানান, আগাম সবজি চাষ করতে হলে জমিতে অনেক বেশি সময় দিতে হয়। এতে সার, সেচ ও শ্রমিকের খরচও বৃদ্ধি পায়। তবে শীতের শুরুতে বাজারে সবজির দাম ভালো পাওয়া যায় বলে তিনি এই ঝুঁকি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, “আগাম সবজি চাষ করতে হলে জমিতে বেশি সময় দিতে হয়। সার, সেচ ও শ্রমিকের খরচও বেশি পড়ে। তবে শীতের শুরুতে বাজারে সবজির দাম ভালো পাওয়া যায়। তাই একটু বেশি পরিশ্রম হলেও আগাম সবজি চাষ করছি। এখন প্রতিদিনই জমিতে আসতে হচ্ছে। কোনো দিন সার দিতে হয়, কোনো দিন আগাছা পরিষ্কার করতে হয়। আবার গাছে রোগবালাই দেখা দিয়েছে কি না, সেটিও দেখতে হয়। আবহাওয়া ভালো থাকলে ফলন ভালো হবে বলে আশা করছি।”
জামালপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলম শরীফ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘জামালপুর জেলায় ১৬ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে শাকসবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে এক হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়েছে। কৃষকরা মাঠে সবজি আবাদ ও বীজতলায় চারা পরিচর্যায় ব্যস্ত রয়েছেন। কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘কৃষকদের হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমাদের পর্যাপ্ত সার বরাদ্দ আছে এবং রবি মৌসুমের জন্যও পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আমরা সেই পরিমাণ সার পাব এবং কৃষকদের মধ্যে সুন্দরভাবে বিতরণ করব। কৃষকরা নিজ নিজ এলাকার সার ডিলারের পয়েন্টে গিয়ে সংশ্লিষ্ট উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে সার সংগ্রহ করতে পারবেন। আমরা কৃষকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক আছি।’