দূরপাল্লার বাস বা ট্রেনে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যখন মানুষ বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নেন, তখনই তারা পড়ে যাচ্ছেন চালক ও যাত্রীবেশী দুর্বৃত্তদের পাতা ফাঁদে। গভীর রাতে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠলেই অস্ত্রের মুখে জিম্মি হয়ে সর্বস্ব লুটে নেওয়া হচ্ছে, আর অনেক ক্ষেত্রে প্রাণ হারাচ্ছেন যাত্রীরা। কুমিল্লা শহরে রাতে বাড়ি ফেরার পথে একের পর এক এমন অপরাধের ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা এই আতঙ্ককে আরও তীব্র করে তুলেছে। এর আগে গত এপ্রিলে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৩৫ বছর বয়সী কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী।

এসব অপরাধের ঘটনায় পুলিশ ও র‍্যাব গ্রেপ্তার করলেও, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে কুমিল্লা শহরের প্রবেশমুখে নেমে নিরাপদে বাসায় ফেরার নিশ্চয়তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে গভীর প্রশ্ন জেগেছে। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পদুয়ার বাজার, ঝাগুরঝুলি ও আলেখারচর বিশ্বরোড থেকে কুমিল্লা নগরে প্রবেশের পথে সিএনজিচালিত অটোরিকশাকেন্দ্রিক অপরাধের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে।

জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে কুমিল্লায় খুনের ঘটনা ঘটেছে ১১১টি। আগস্ট মাসে হত্যার মামলা ছিল ১১টি এবং সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ১৬টিতে দাঁড়িয়েছে। ডাকাতির মামলা ২টিতে থেকে বেড়ে ৩টি এবং চুরির মামলা ৩৫টি থেকে বেড়ে ৪৪টি হয়েছে। এছাড়া দস্যুতার মামলা হয়েছে পাঁচটি।

কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়। তিনি প্রশিক্ষণ শেষে ২৪ এপ্রিল দিবাগত রাতে চট্টগ্রাম থেকে বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। ঘুমের কারণে পদুয়ার বাজারে নামতে না পেরে তিনি কুমিল্লা আদর্শ সদর ঝাগুরঝুলি বিশ্বরোডে নামেন। সেখান থেকে নগরের পানপট্টি গাংচর এলাকায় বাসায় যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন। ওই রাতে যখন তাঁর মা-বাবা, স্ত্রী ও শিশুপুত্র তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন, ঠিক তখনই চালক ও যাত্রীবেশী ছিনতাইকারীরা তাঁকে মারধর ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে চলন্ত অটোরিকশা থেকে ফেলে দেয়। পরদিন সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ী এলাকায় আইরিশ হিল হোটেলের পাশ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় র‍্যাব বা বর্তমানের স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে। বাহিনীটি জানিয়েছে, তাঁরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

সম্প্রতি ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর হত্যাকাণ্ড জনমনে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নগরের নজরুল অ্যাভিনিউ এলাকার একটি বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ওই ছাত্রীর মরদেহ গত বৃহস্পতিবার লালমাই উপজেলার ভোরাজগতপুর গ্রামের ধানখেত থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, রাতে নগরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় ফেরার জন্য ওই কিশোরী একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠেছিলেন। চালক সুমন মিয়া তাকে উল্টো পথে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ঘুরিয়ে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করেন। চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং শনিবার কুমিল্লার আদালতে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁর কাছ থেকে মেয়েটির লুটে নেওয়া আইফোনটিও উদ্ধার করা হয়েছে।

সন্দেহজনক পরিস্থিতির মুখে পড়েছিলেন ঠাকুরপাড়া এলাকার ৩০ বছর বয়সী এক নারীও। গত মাসের প্রথম সপ্তাহে পাঁচ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে গাজীপুরে শ্বশুরবাড়ি থেকে কুমিল্লায় ফিরছিলেন তিনি। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে নেমে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করেন। ওই নারী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “অটোরিকশার চালক কিছু দূর যাওয়ার পর এক ব্যক্তিকে গাড়িতে তোলেন। চালক বলেছিলেন, লোকটি সামনেই নেমে যাবেন। কিন্তু অনেকটা পথ যাওয়ার পরও তিনি নামছিলেন না। তখন ওই নারী চালককে গাড়ি থামাতে বলেন। তাঁর স্বামীও মুঠোফোনে কথাগুলো শুনছিলেন এবং তাঁকে নেমে যাওয়ার পরামর্শ দেন।”

একপর্যায়ে ওই নারী চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করলে জাঙ্গালিয়ার কাছাকাছি গিয়ে চালক ওই ব্যক্তিকে নামিয়ে দেন। এরপর চালকের মুঠোফোনে একের পর এক কল আসতে থাকে এবং অপর প্রান্ত থেকে বারবার জানতে চাওয়া হচ্ছিল তিনি কোন দিকে যাচ্ছেন। চালক কোটবাড়ি সড়ক হয়ে রামমালা দিয়ে যাওয়ার কথা বললে নারীটি কান্দিরপাড় হয়ে যেতে বলেন এবং শেষ পর্যন্ত চালক ওই পথেই যান। ওই নারী বলেন, “১৫ বছর বয়সী মেয়েটির এমন মৃত্যু দেখে সেদিনের ঘটনা বারবার মনে পড়ছে। ওই দিন আমার সঙ্গেও কি এমন ঘটনা ঘটত? এখন রাতে চলাচল করতে ভয় লাগে।”

গত এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে মধ্যরাতে পদুয়ার বাজার থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠে ছিনতাইয়ের শিকার হন ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আতিকুর রহমান। তাঁর বাসা নগরের কান্দিরপাড় এলাকায়। তিনি জানান, অটোরিকশায় ওঠার পর যাত্রীবেশী ছিনতাইকারীরা অস্ত্রের মুখে তাঁকে জিম্মি করে মুঠোফোন, টাকা ও অন্যান্য মালামাল নিয়ে যায়।

নগরের ছোটরা এলাকার বাসিন্দা বিল্লাল হোসেন জানান, গত মে মাসে তাঁর নিকটাত্মীয় দেলোয়ার হোসেন চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে কুমিল্লায় আসেন। রাত ১২টার দিকে স্টেশন থেকে অটোরিকশায় ওঠার পর যাত্রীবেশী তিন ছিনতাইকারী তাঁকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে জিম্মি করে এবং পরে গোমতী নদীর পাড়ে নিয়ে তাঁর সর্বস্ব লুটে নেয়।

এর আগে ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট রাতে নগরের শাকতলা এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হন একটি জাতীয় দৈনিকের বিজ্ঞাপন বিভাগের ব্যবস্থাপক সাইমুম ইমতিয়াজ। কুমিল্লা বেড়াতে এসে তিনি স্ত্রী ও শ্যালককে নিয়ে পদুয়ার বাজার থেকে অটোরিকশায় শহরের দিকে যাচ্ছিলেন। এ সময় চারজন তাঁদের পথ আটকে দুটি আইফোনসহ পাঁচটি মুঠোফোন, স্ত্রীর হীরার আংটি ও ১০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। ইমতিয়াজ জানান, থানায় অভিযোগ দিলেও মালামাল উদ্ধার হয়নি এবং ওই ঘটনায় অটোরিকশাচালকের যোগসূত্র রয়েছে বলে তাঁর সন্দেহ।

এসআরবি-১১ সিপিসি-২-এর উপপরিচালক ও কোম্পানি কমান্ডার মেজর সাদমান ইবনে আলম বলেন, বুলেট বৈরাগী হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার পাঁচজনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁদের সবাই মাদকাসক্ত ছিলেন। সর্বশেষ কিশোরী হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক সুমনও মাদকাসক্ত বলে জানা গেছে। আরও কিছু ঘটনা পর্যালোচনা করে ছিনতাই চক্রের বড় একটি অংশের সঙ্গে মাদকের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

রাতে একা চলাচলকারীদের জনবহুল বাসস্ট্যান্ডে নামা, সম্ভব হলে অন্য যাত্রীর সঙ্গে অটোরিকশা ভাগ করে যাতায়াত করা এবং নির্ধারিত স্থানের বাইরে না নামার পরামর্শ দেন এসআরবির কর্মকর্তা সাদমান ইবনে আলম।

কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, পদুয়ার বাজার থেকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় রাতে শহরে ফেরার পথে সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকেন্দ্রিক ছিনতাইয়ের অভিযোগ বেশি। মহাসড়কের পাশে বিভিন্ন অটোরিকশার স্ট্যান্ড রয়েছে। সাম্প্রতিক অভিযানে এসব এলাকায় মাদক সেবনের অভিযোগে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত আছে বলে জানান লুৎফর রহমান। তিনি বলেন, পদুয়ার বাজার ও আলেখারচর বিশ্বরোড দিয়ে রাতে নগরে প্রবেশের পথে পুলিশ দুই পালায় টহল দিচ্ছে। ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে পুলিশ সদস্যদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর আইফোন ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে হত্যা করা হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের একমাত্র সন্তান সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে (১৩)। এরপর জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। সর্বশেষ বাড়ি ফেরার পথে কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় রাতে নিরাপদে বাড়ি ফেরা নিয়ে মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।

হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ বলেন, মহাসড়কের বিস্তৃতির তুলনায় তাঁদের জনবল কম। জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে টহল বাড়ানো হয়েছে। তবে এক জায়গায় পুলিশ থাকলে অন্য জায়গা ফাঁকা হয়ে যাওয়ার সুযোগ নেয় অপরাধীরা।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নগরের প্রবেশমুখগুলোতে ক্লোজড সার্কিট (সিসিটিভি) ক্যামেরা স্থাপন ও পুলিশের তল্লাশিচৌকি বসানো প্রয়োজন বলে মনে করেন সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায়। তিনি আরও বলেন, রাতে মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশের টহল বাড়ানোর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো নিয়মিত নজরদারিতে রাখতে হবে।