ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের পর জাতীয় সংসদের যে সংরক্ষিত নারী আসনটি শূন্য হয়েছে, সেটি পূরণে কে সুযোগ পাবেন—তা নিয়ে বিএনপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। এই শূন্য আসনে মনোনয়ন পেতে এখন দৌড়ঝাঁপ চালাচ্ছেন দলের কেন্দ্রীয় নেত্রীরা এবং সাবেক সংসদ সদস্যরা। শুধু কেন্দ্রীয় পর্যায় নয়, জেলা পর্যায়ের সংগঠকরাও এই আসনে দলের মনোনয়ন পাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। এমন অনেক মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন, যাঁরা এবার সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন চেয়েও পাননি। আবার কেউ কেউ সরাসরি সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাওয়ার লড়াইয়ে ছিলেন। তাঁদের ধারণা, মিষ্টির পদত্যাগের ফলে তাঁদের সামনে এখন নতুন এক সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের মতে, দল বর্তমানে ক্ষমতায় থাকায় ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য হওয়ার আগ্রহীদের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। দলের পরিচিত নেত্রীদের পাশাপাশি আরও অনেকে এই পদের জন্য মনোনয়ন পেতে চেষ্টা ও তদবির করছেন। অনেক প্রার্থীই কেন্দ্রীয় নেতাদের অফিস ও বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করছেন। তবে এই আসনে দল শেষ পর্যন্ত কাকে বেছে নেবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। যদিও মহিলা দলসহ বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাদের মধ্যে এই আসনটি নিয়ে প্রবল আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নাম সামনে আসার পর রাজনৈতিক দায় নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন মিষ্টি। এরপর প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনার পর গত ১ অক্টোবর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। তবে হামলা ও ভাঙচুরে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না বলে দাবি করেছেন মিষ্টি।
সংরক্ষিত নারী আসন থেকে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের কারণে একটি আসন শূন্য হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের আনুপাতিক হারে দলগুলো সংরক্ষিত নারী আসন পায়। ফলে মিষ্টির পদত্যাগে শূন্য হওয়া আসনটি বিএনপির কোটায় পড়ে, তাই দলটিই সিদ্ধান্ত নেবে কে এই আসনে সংসদে যাবেন।
জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪-এর ২৭ ধারা অনুযায়ী, আসন শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়। সেই হিসেবে আগামী ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে এই নির্বাচন হওয়ার কথা। তবে নির্বাচন কমিশন এখনো এ বিষয়ে কোনো তফসিল ঘোষণা করেনি।
চলতি বছর বিএনপির মনোনয়নে ৩৬ জন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। গত ৩০ এপ্রিল তাঁদের নির্বাচিত হওয়ার গেজেট প্রকাশিত হয় এবং ৩ মে তাঁরা শপথ গ্রহণ করেন। তবে শপথ নেওয়ার মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যেই সংসদ সদস্য পদ ছেড়েছেন মিষ্টি।
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিষ্টির শূন্য আসনের জন্য আলোচনায় আছেন দলটির সহ-মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া। তিনি এর আগেও সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হারুনুর রশিদের স্ত্রী পাপিয়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এক অনুষ্ঠানে যোগ্য নারীদের দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপির উদারতার অভাব রয়েছে—এমন অভিযোগ করে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছিলেন তিনি।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে হারুনুর রশিদ বিএনপির মনোনয়ন পেয়েও জামায়াতের প্রার্থীর কাছে হেরে যান। তখন দলের ভেতরে আলোচনা ছিল যে সংরক্ষিত আসনে হয়তো পাপিয়াকে সদস্য করা হবে। তবে বর্তমানে আলোচিত দম্পতির দুজনই সংসদের বাইরে রয়েছেন। তাই এই দম্পতির অনুসারীরা পুনরায় আশা দেখছেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আইনজীবী শাহানা আক্তার সানুও এই শূন্য পদ পেতে তৎপর। ফেনীর সোনাগাজীর এই নেত্রী ছাত্রদলের রাজনীতি থেকে উঠে এসেছেন। তিনি বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক এবং কলেজ ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি মহিলা দলের যুগ্ম সম্পাদকও ছিলেন। এবার সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন না পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির আরেক সদস্য আয়শা সিদ্দিকা মনি। বাগেরহাটের রাজনীতিতে সক্রিয় এই নেত্রী এর আগে সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন। ২০২৫ সালে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ আন্দোলনে নারীদের অবদানবিষয়ক বিএনপির কমিটিতেও তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
মহিলা দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক শাহিনুর নার্গিসও মনোনয়নপ্রত্যাশী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি ছিলেন। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। এছাড়া তিনি স্বেচ্ছাসেবক দলের শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ মহিলা দলের নেতৃত্বেও ছিলেন।
স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক আইনজীবী শাহিনুর বেগম সাগরের নামও আলোচনায় রয়েছে। নোয়াখালীর এই নেত্রী কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। পরে তিনি স্বেচ্ছাসেবক দলের মহিলাবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-৪ আসনে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়নের তালিকায় তাঁর নাম ছিল।
মহিলা দলের কেন্দ্রীয় মানব উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক খন্দকার ফারহানা আতিকাও মিষ্টির এই আসনে আগ্রহী। তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক টিমের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিভিন্ন জেলায় মহিলা দলের সাংগঠনিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।
বরিশাল মহানগর বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়কায়ক আফরোজা খানম নাসরিনও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন। তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে খালেদা জিয়াসহ নেতা-কর্মীদের মুক্তির দাবিতে বরিশালে বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে ফেরার পথে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক মাসুদা আফরোজ হক সূচিও মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে একজন। গত নির্বাচনে তিনি নাচোল, গোমস্তাপুর ও ভোলাহাট নিয়ে গঠিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন। জেলা মহিলা দলের দায়িত্বের পাশাপাশি ওই এলাকায় দলীয় কর্মসূচি ও জনসংযোগে তিনি সক্রিয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে নাচোলে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি।
দিনাজপুর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাসনাহেনা চৌধুরী হীরার নামও আলোচনায় আছে। ২০২২ সালের মে মাসে জেলা বিএনপির সম্মেলনে কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন তিনি। তিনটি সাংগঠনিক সম্পাদক পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২৩৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন হীরা। প্রায় এক যুগ পর অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনে কাউন্সিলরদের ভোটে তিনি জেলা নেতৃত্বে আসেন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দল ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সভাপতি রুনা লায়লাও মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকায় রয়েছেন।
বিএনপির দায়িত্বশীল একজন কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “পদ একটা, দাবিদার এক ডজনের বেশি। দলের অঙ্গসংগঠনে যাঁরা দীর্ঘদিন সক্রিয় আছেন, তাঁরা বিবেচনার দাবি রাখেন। আবার দলের সমর্থক, সংসদে ভূমিকা রাখতে পারেন—এমন যোগ্য নারীও আছেন। সব দিক বিবেচনা করেই একজনকে বেছে নেওয়া হবে। সবাইকে তো খুশি করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তিনি এখনো তা প্রকাশ করেননি। ফলে এখন যত নাম আসছে, সবই আলোচনা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।”