২০১৮ সালের ৪ মে। বিরল ও দুর্লভ প্রজাতির পাখির প্রজনন পরিবেশ নিয়ে গবেষণার কাজে গিয়েছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাবুডাইং এলাকায়। আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের অধ্যুষিত এই টিলাময় অঞ্চলটি তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। এখানে রয়েছে চমৎকার সর্পিল খাঁড়ি, ফলের বাগান এবং প্রচুর গাছপালা, যার ফলে এই এলাকায় পাখি ও বন্যপ্রাণীর কোনো অভাব নেই। সেখানে পৌঁছে গবেষক প্রথমেই দেখতে পান অধরা নাগরবাটই পাখিকে, তবে ছবি তোলার চেষ্টা করতেই অত্যন্ত চতুর এই পাখিটি দ্রুত পালিয়ে যায়। এরপর গাছের ডালে বসে পালক পরিষ্কার করতে দেখা যায় এক জোড়া লাটোরা বা বিমান পাখিকে। তাদের পাশেই একটি ধৌলি ফিঙে তার ডিমে তা দিচ্ছিল। আরও কিছুটা সামনে এগোতেই একটি শিশুগাছের গুঁড়িতে পোকা খুঁজতে দেখা যায় একটি সোনালি কাঠঠোকরাকে। পাশের গাছের ঘন সবুজ পাতায় ঢাকা ছোট ডালে একটি কাঠ কসাই বা বনলাটোরাকে দোল খেতে দেখা যায়, যা ছিল এক চমৎকার দৃশ্য।
ঘড়িতে যখন দুপুর ১টা বেজে ২৮ মিনিট, ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ কয়েকটি পাখির সম্মিলিত ডাক শুনে দ্রুত পাশের টিলায় ছুটে যান গবেষক। কিছুক্ষণ আগেই তিনি অটোরিকশা থেকে সেখানে নেমেছিলেন। সেখানে গিয়ে তিনি যা দেখলেন, তাতে রীতিমতো চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। একটি ছোট শিশুগাছের মগডালে তামাটে, কমলা, ধূসর এবং সাদার সংমিশ্রণে এক অপূর্ব রঙের পাখি বসে পালক পরিচর্যা করছিল। এই বিশেষ পাখিটিকে তিনি এর আগে ২৯ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখের দুপুরে পূর্বাচল আবাসিক এলাকার একটি শিমগাছের মাচায় প্রথমবার দেখেছিলেন। ঠিক ২৫ মিনিট পর আশপাশের পরিবেশ থেকে একটি পাখির ছানার কান্নার শব্দ ভেসে আসে। চারপাশ খুঁজি খুঁজি অবশেষে আরেকটি শিশুগাছে ছানাটির সন্ধান পাওয়া যায়। ঠিক সেই সময় একই প্রজাতির একটি বড় পাখি এসে ছানাটির মুখে পোকা গুঁজে দেয় এবং সাথে সাথেই তার কান্না থেমে যায়। সেদিন বিকেল সোয়া পাঁচটা পর্যন্ত তিনি ওই পাখিগুলোর সাথে সময় কাটান এবং এর মাধ্যমে তাদের মা-বাবা ও বাসার অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে ২৫ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখের দুপুরে রাজশাহীর পদ্মার ১০ নম্বর চরে সর্বশেষ এই পাখিগুলোকে দেখা গিয়েছিল।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাবুডাইংয়ের শিশুগাছে বাসা ও ছানাসহ যে পাখিটি দেখা গেছে, সেটি এ দেশের একটি বিরল আবাসিক পাখি। তবে কিছু ক্ষেত্রে এই প্রজাতির পাখি শীতকালীন পরিযায়ী হিসেবেও দেশে আসে। বাংলাদেশে এই পাখিটির কোনো প্রচলিত বাংলা নাম নেই। তবে কেউ কেউ একে তামাপিঠ লাটোরা বা কসাই বলে থাকেন। পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় ভাষায় এটি পচানাক, ছোট কিলাতোড়, খয়েরি ক্যারকাটা ও ছোট লাটোরা নামে পরিচিত। ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘বে–ব্যাক্ট শ্রাইক’। এর গোত্র ল্যানিডি এবং বৈজ্ঞানিক নাম Lanius vittatus। Lanius শব্দের অর্থ হলো কসাই। যেহেতু এশিয়ার কসাই পাখিদের মধ্যে এটিই আকারে সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম, তাই গবেষক এর জন্য ‘ছোট লাটোরা’ নামটি বেছে নিয়েছেন। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এবং মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার কিছু কিছু দেশে এই পাখির দেখা মেলে।
শারীরিক গঠনের দিক থেকে ছোট লাটোরা লম্বায় মাত্র ১৭-২০ সেন্টিমিটার এবং ওজনে ১৮-২৬ গ্রামের মতো হয়। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির চোখের বরাবর একটি চওড়া কালো পট্টি থাকে, যা কপাল পর্যন্ত বিস্তৃত। মাথার উপরিভাগ থেকে ঘাড় পর্যন্ত পালকগুলো ছাই-ধূসর রঙের, যা দেখতে অনেকটা সাদাটে মনে হয়। এদের পিঠের রং মরচে-বাদামি এবং কোমর হালকা ধূসরাভ-সাদা। ডানা ও লেজ কালো রঙের এবং ডানার দুই পাশে সাদা ছোপ থাকে। পেটসহ শরীরের নিচের অংশ সাদা এবং পেটের দুই পাশ গাঢ় কমলা-বাদামি রঙের হয়। চোখের মণি, ঠোঁট, পা ও নখ কালো রঙের। স্ত্রী ও পুরুষ পাখির চেহারায় তেমন কোনো পার্থক্য নেই। তবে অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির শরীরের ওপরের অংশ হলদেটে-বাদামি এবং তার ওপর ঘন আঁশ-ছোপ থাকে। শরীরের নিচের অংশেও এই আঁশ-ছোপ দেখা যায়।
সাধারণত চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, ঢাকা ও চট্টগ্রামে এদের বেশি দেখা যায়। এরা মূলত কৃষিজমি, বাবলা ও শিশুগাছের সারি, কাঁটাযুক্ত ঝোপঝাড় এবং হালকা বাগানে বিচরণ করে। সচরাচর একাকী অথবা জোড়ায় জোড়ায় এদের অবস্থান লক্ষ্য করা যায় এবং প্রতিটি পাখির নির্দিষ্ট আলাদা বিচরণক্ষেত্র থাকে। এরা অত্যন্ত সাহসী প্রকৃতির পাখি। এদের খাদ্যতালিকায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কীটপতঙ্গ, টিকটিকি, গিরগিটি, সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুরের ছানা, ছোট পাখি ও পাখির ছানা। অন্যান্য কসাই বা লাটোরার মতো এরাও শিকার ধরে জ্যান্ত অবস্থাতেই নৃশংসভাবে বাবলা, বেল বা কণ্টকময় গাছের কাঁটায় গেঁথে রাখে। এদের ডাক বেশ কর্কশ, যা শুনতে ‘চাররর...চাররর...’, ‘টিচা-ক্র্যাক্...টিচা-ক্র্যাক্...চাররর’ এর মতো মনে হয়। এছাড়া এরা অন্য পাখির ডাক অনুকরণ করতেও সক্ষম।
ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এদের প্রজননকাল। এই সময়ে তারা ভূমি থেকে ২-৩ মিটারের মধ্যে গাছের ডালের খাঁজে ঘাস ও লতাপাতা ব্যবহার করে চ্যাপ্টা বাটির মতো বাসা তৈরি করে। তারা সাধারণত ৩-৬টি ডিম পাড়ে। ঘিয়ে-সাদা রঙের এই ডিমগুলোর ওপর লালচে-বাদামি রঙের ঘন ছিটছোপ থাকে। ১৪-১৫ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। স্ত্রী ও পুরুষ পাখি যৌথভাবে ডিমে তা দেয় এবং ছানাদের লালনপালন করে। ছানারা ১৪-১৫ দিনের মধ্যেই উড়তে শেখে। এই প্রজাতির পাখির সর্বোচ্চ আয়ুষ্কাল ৮ বছর।
আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর