বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাখির আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা ‘বার্ড ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’-এর ২০২৬ সালের আসরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে জমা পড়েছিল ২৪ হাজারের বেশি ছবি। এই প্রতিযোগিতার সেরা ছবিগুলোতে কখনো ধরা পড়েছে পাখির আচরণের দুর্লভ মুহূর্ত, আবার কখনো প্রকৃতির সঙ্গে তাদের অসাধারণ মেলবন্ধন। পাশাপাশি কিছু ছবিতে উঠে এসেছে পাখি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা। বার্ড ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ারের ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত সেরা কিছু ছবির গল্প এখানে তুলে ধরা হলো।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ অঙ্গরাজ্যে প্রজনন মৌসুমের এক দৃশ্য। সেখানে একটি পুরুষ গ্রেটার সেজ-গ্রাউসকে দেখা যায়। পেছনের ছায়ায় ঢাকা সেজব্রাশের পাহাড়ের ওপর তখন সূর্য উঠছিল। সেই বিশেষ আলো পাখিটির লেজের পালকে এমনভাবে পড়েছিল যে মনে হচ্ছিল, পালকগুলো যেন আলো ছড়াচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের স্কোমার দ্বীপে ধরা পড়েছে একটি আটলান্টিক পাফিন। ভোরের শুরু ও সন্ধ্যার শেষভাগে পাফিনের ছবি তুলতে কয়েক দিন স্কোমারে কাটিয়েছেন আলোকচিত্রী। এ সময় দিনের পর্যটকেরা দ্বীপ ছেড়ে চলে যেতেন, ফলে পাখিগুলোকে প্রায় নিজের মতো করে পাওয়া যেত।
ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম পাপুয়ার রেইনফরেস্টে একটি পুরুষ ওয়েস্টার্ন প্যারোটিয়াকে দেখা যায়, যে স্ত্রী পাখিকে আকৃষ্ট করতে নাচছে।
কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ফ্রেজার নদীর বদ্বীপের লবণাক্ত জলাভূমির ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একটি শর্ট-ইয়ার্ড আউল। সন্ধ্যা নামার সময় সেখানে পাঁচটি প্যাঁচাকে শিকার করতে দেখেছিলেন আলোকচিত্রী। তাঁর ভাষায়, “সেটি ছিল এক জাদুকরি সন্ধ্যা।”
নরওয়ের হর্নোয়া দ্বীপের আকাশে উড়ছে একঝাঁক গিলেমট। ছবিটি প্রথম দেখলে মনে হয় যেন কোনো পাজল। চলমান বিশৃঙ্খলার মধ্যেও সেখানে এক আশ্চর্য শৃঙ্খলা ফুটে উঠেছে।
পোল্যান্ডের ড্যাব্রোভা গুরনিচার একটি জলাভূমিতে এক রিডবেড থেকে আরেক রিডবেডে উড়ে যাচ্ছে একটি বিটার্ন। সূর্য ওঠার সময় পানিতে ভাসমান একটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্র থেকে এই ছবিটি তোলা হয়েছে।
কেনিয়ার অ্যাম্বোসেলির শুকনো হ্রদের তলদেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে একটি উটপাখি। সাদা-কালো ছবিতে শুষ্ক ভূদৃশ্যটি ধুলা আর উত্তাপের মধ্যে পাখিটির একাকী পথচলাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের পোমোনায় প্রতিবেশীর বাড়ির ফটকের পাশে আছে একটি গ্রাস ট্রি, যাকে জ্যান্থোরিয়া নামেও ডাকা হয়। ধীরে বেড়ে ওঠা এই রসাল উদ্ভিদ অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয়। এর প্রায় ৩০টি প্রজাতি আছে। গাছে বড় ফুলের মঞ্জরি হয়, যাতে প্রচুর মধু থাকে। সেই মধুর টানে এখানে একটি ছোট ওয়াটলবার্ডের পাশাপাশি প্রজাপতি ও স্থানীয় মৌমাছিও এসেছে।
তাসমানিয়ার একটি লিটল পেঙ্গুইন রাতে এই পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিল। কাছের ঝোপঝাড়ের নিরাপদ জায়গায় তার ওর বাসা।
অস্ট্রেলিয়ার পার্থের একটি বনে বৃষ্টি পড়ছে। গাছের বাকল ও ছায়ার সঙ্গে প্রায় মিশে থাকা একটি টনি ফ্রগমাউথ ডানা মেলেছে। দেখে মনে হচ্ছে, বৃষ্টির ফোঁটা থেকে সে যেন তার ভাইবোনদের আড়াল করে রাখছে।
কানাডার পশ্চিম উপকূলের গ্রেট বিয়ার রেইনফরেস্টে সেদিনও টানা বৃষ্টি হচ্ছিল। বনের ভেতর একটি জলপথ দিয়ে ধীরে ধীরে জোডিয়াক নৌকায় যাচ্ছিলেন আলোকচিত্রী। হঠাৎ দেখতে পান ডানা মেলে দাঁড়িয়ে থাকা একটি চমৎকার তরুণ বল্ড ঈগল।
মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপের তুলুমের সমুদ্রসৈকতে এক জেলের সমান্তরালে অবস্থান নিয়েছিলেন আলোকচিত্রী। জেলের ফেলে দেওয়া মাছ বারবার আকাশে পাখিদের মধ্যে লড়াই বাঁধছিল। কয়েক মিটার ওপর দিয়ে উড়ছিল ফ্রিগেটবার্ডগুলো। জেলে যখনই একটি মাছ ওপরে ছুড়ে দিচ্ছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে আকাশে শুরু হচ্ছিল হইচই।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির ওয়ারেন কাউন্টির একটি স্থানীয় পুকুরে ছবিটি তোলা। সেখানে মানুষের প্রবেশ সীমিত। তাই ভুট্টাখেতের পেছন দিক দিয়ে হেঁটে পুকুরে পৌঁছেছিলেন আলোকচিত্রী। বুক পর্যন্ত ওঠা পানির পোশাক পরে কাদামাটির একটি জায়গার দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানেই দেখা মেলে গ্রেট ব্লু হেরনের।
কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনের কেন্দ্রস্থলে বিক্রির জন্য রাখা হয়েছে ইয়েলো বিটার্নসহ বিভিন্ন জলচর পাখি। পাখি শিকার ও বাণিজ্য নিয়ে করা এক অনুসন্ধানের সময় ছবিটি তোলা হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, দেশটির বিভিন্ন জায়গায় বন্য পাখি অবৈধভাবে বিক্রি করা হচ্ছে।
মাল্টায় একটি মিসরীয় শকুন। পরিযায়ী পাখি শিকার দেশটির আইনে নিয়ন্ত্রিত হলেও এর লঙ্ঘন এখনো ব্যাপক। প্রতি মৌসুমে কয়েক ডজন, কখনো কয়েক শ সংরক্ষিত ও বিরল পাখি অবৈধভাবে মারা হয়। শিকারিদের অন্যতম লক্ষ্য থাকে বিভিন্ন শিকারি পাখিও।
নরওয়ের অসলোয় গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরম দিনে বাতাস কেটে উড়ে যাচ্ছে একটি কমন সুইফট। নীল রঙের একটি গাড়ির চকচকে ছাদে প্রতিফলিত পাখিটির একাধিক এক্সপোজার ক্যামেরার ভেতরেই তৈরি করে ছবিটি তোলা হয়েছে।
স্কটল্যান্ডের শেটল্যান্ডে একটি নর্দার্ন গ্যানেট। শিকার ধরতে ডজন ডজন গ্যানেট পানিতে ঝাঁপ দিচ্ছিল। প্রতিবার পাখিগুলো পানির পৃষ্ঠ ভেদ করার সঙ্গে সঙ্গে কালো পানিতে তৈরি হচ্ছিল নতুন নতুন ঢেউ। মুহূর্তের জন্য দৃশ্যমানতা হারিয়ে যাচ্ছিল আর পানির নিচে পাখিগুলো বুদবুদের ধারা তৈরি করে এগিয়ে যাচ্ছিল চোখের পলকে।
গ্রেট ক্রেস্টেড গ্রিবের এই ছবি পোল্যান্ডের ব্রোদনিকা লেক অঞ্চলে কায়াক থেকে তোলা। যেন আঁকা ছবি! বিশেষ কৌশল খাটিয়ে ছবিটি তোলার পাশাপাশি কায়াক সামলানোও বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল বলে জানিয়েছেন তিনি।
ইতালির রোমে উঁচু ভবনগুলো হলুদ পায়ের গাঙচিলের জন্য অনেকটা সমুদ্রের পাথুরে খাড়াইয়ের মতো। এসব ভবনে তারা বাসা বাঁধে, বিশ্রাম নেয় এবং শহরের মধ্যে টিকে থাকার জন্য নিরাপদ জায়গা খুঁজে পায়। এমনই একটি ছোট উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল একটি ভবনের ছাদে। সেখানেই পাখিটির ছবি তোলা হয়েছে।
অ্যান্টার্কটিকার ডিসেপশন দ্বীপের ইতিহাস বেশ অস্থির। একসময় এখানে সিল শিকারের ব্যবসা ছিল, পরে তিমি শিকারের কেন্দ্র হয়। এরপর একের পর এক আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে বৈজ্ঞানিক গবেষণাকেন্দ্রগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু এখন প্রকৃতি আবার জায়গাটি নিজের মতো করে নিয়েছে। ছবিতে একটি মরচে ধরা তিমির চর্বি সংরক্ষণের গুদামের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি জেন্টু পেঙ্গুইন, যেন তারা পাহারা দিচ্ছে।
স্পেনের এলিন শহরে একটি ব্লু রক থ্রাশ। একটি পরিত্যক্ত বাড়ির ভেতর থেকে দূরনিয়ন্ত্রিত ক্যামেরায় পাখিটির ছবি তোলা হয়েছে। পাখিটি যখন বাড়ির ভেতরে ঢুকছিল বা বের হচ্ছিল, তখন সন্ধ্যা; জানালা গলে পুরোনো কাঠের ওপর পড়েছে সন্ধ্যার আলো। আর তাতে তৈরি হয়েছে উষ্ণ আলো–ছায়া।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লস গ্যাটোসে নিজের বাড়ির পাশের একটি পার্কে দুটি গ্রেট হর্নড আউলকে বাসা বাঁধতে দেখেছিল পারহাম। সন্ধ্যায় তাদের ভালো একটি পোর্ট্রেট তোলার আশা নিয়ে বেরিয়েছিল সে। কিন্তু দিগন্তে পূর্ণিমার চাঁদ উঠতে দেখে তাঁর পরিকল্পনা বদলে যায়। একটি প্যাঁচা উড়ে গিয়ে পাইনগাছে বসে। দ্রুত জায়গা বদলে চাঁদের সামনে পাখিটিকে রেখে ছবিটি তোলে সে।
স্কটল্যান্ডের শেটল্যান্ডে পানির ভেতর ডুব দেওয়ার সময় মনে হচ্ছে যেন সূর্যের বুক চিরে বেরিয়ে আসছে একটি নর্দার্ন গ্যানেট। এই সুন্দর পাখিগুলোর জীবন যেন দুই রকম। বাসায় তারা ছানাকে যত্নে বড় করে। আবার সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্কও দৃঢ় করে—দুটি পাখি ঠোঁট আকাশের দিকে তুলে একে অপরের সাদা ঘাড় আলতো করে স্পর্শ করে।
চাঁদের সামনে কালো ছায়ার মতো ভেসে যাচ্ছে একটি রাজকীয় গোল্ডেন ইগল। তার মেলে ধরা ডানা রুপালি আলোয় আকাশজুড়ে শক্তিশালী এক অবয়ব তৈরি করেছে।
অ্যান্টার্কটিকার অপূর্ব পোর্ট শারকো উপসাগরে সাঁতার কাটছিলেন আলোকচিত্রী। হঠাৎ একঝাঁক জেন্টু পেঙ্গুইন এসে হাজির হয়। মাছ ও ক্রিল খেতে তারা সেদিকে যাচ্ছিল।