মেহেরপুরে একটি সংবাদ প্রকাশের জেরে এক সাংবাদিককে ‘পিঠের ছাল তুলে নেওয়ার’ হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মেহেরপুর জেলা বিএনপি নেতার ছোট ভাই ও শিক্ষক রাকিবুল হাসান রিপনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ করা হয়েছে যে, তিনি কেবল শারীরিকভাবে আঘাত করার হুমকিই দেননি, বরং মাহাবুব চান্দুকে মেহেরপুরে সাংবাদিকতা করতে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রকাশকারী অন্যান্য সাংবাদিকদেরও সেখানে কাজ করতে না দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

ভুক্তভোগী সাংবাদিক মাহাবুব চান্দু দৈনিক এদিন পত্রিকার মেহেরপুর প্রতিনিধি এবং মেহেরপুর জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি স্থানীয় একটি পত্রিকার সম্পাদকও বটে। অন্যদিকে, অভিযুক্ত রাকিবুল হাসান রিপন মেহেরপুরের আহাম্মদ আলী টেকনিক্যাল কলেজের প্রভাষক এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসানের ছোট ভাই।

এই হুমকির ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মাহাবুব চান্দু স্থানীয় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

গত রোববার (১১ অক্টোবর) দুপুরে সাংবাদিক মাহাবুব চান্দু তার ফেসবুক আইডিতে এই ঘটনার বিবরণ দিয়ে একটি পোস্ট করেন। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, মোবাইল ফোনে কল করে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়া হয়েছে।

পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘মেহেরপুরে জেলা বিএনপি নেতার ছোট ভাই এর মোবাইল থ্রেট…“তোর পিঠের ছাল তুলে নেব শুয়োরের বাচ্চা। তুই কোথায় আছিস বল।”’ একই সঙ্গে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, তাকে হুমকি দেওয়ার সেই কল রেকর্ড তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

মাহাবুব চান্দু জানান, মেহেরপুর প্রতিদিন পত্রিকায় ‘মেহেরপুরে সার ডিলার নিয়োগে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের কারণেই তাকে এই হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বিষয়টি তুলে ধরার পর রাকিবুল হাসান রিপন সেখানেও হুমকি দিয়ে মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ তার।

ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে মাহাবুব চান্দু বলেন, রাকিবুল হাসান রিপন আমার মোবাইল ফোনে কল দিলে আমি রিসিভ করি। এ সময় সংবাদে স্বজনপ্রীতির বিষয়টি উল্লেখ করা এবং সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশের প্রসঙ্গ তুলে রিপন আমাকে গালিগালাজ করেন। একপর্যায়ে বলেন, ‘পিঠের ছাল তুলে নেব শুয়োরের বাচ্চা, তুই কোথায় আছিস বল।’ পরে আমি কলটি কেটে দিই।

এই অভিযোগের বিষয়ে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে রাকিবুল হাসান রিপন স্বীকার করেন যে, মাহাবুব চান্দুর প্রকাশিত সংবাদে দলীয়করণের কথা বলা হয়েছে। তবে সংবাদে স্বজনপ্রীতির যে কথা লেখা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি জবাব চেয়েছেন বলে দাবি করেন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, এর জবাব বা ব্যাখ্যা দিতে না পারলে মাহাবুব চান্দুকে মেহেরপুরে সাংবাদিকতা করতে দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, আমরা এখন সরকারে আছি, যারা বিএনপি করেছে, তারা একটু সুবিধা পাবে, এটাই স্বাভাবিক।

রিপন আরও অভিযোগ করেন যে, মাহাবুব চান্দুর পত্রিকায় আয়নাঘর নিয়ে কোনো সংবাদ প্রকাশ করা হয় না। এমনকি কয়েক হাজার মানুষ হত্যার পর শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেছেন, এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও তার পত্রিকায় লেখা হয় না। অথচ সার ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতির কথা লেখা হয়েছে।

রিপন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এ বিষয়ে হিসাব মিলিয়ে দিতে না পারলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান রাখা হবে না এবং মাহাবুব চান্দুকে মেহেরপুরে সাংবাদিকতাও করতে দেওয়া হবে না। পাশাপাশি এই সংবাদ যিনি প্রকাশ করবেন, তাকেও মেহেরপুরে সাংবাদিকতা করতে দেওয়া হবে না বলে হুমকি দেন তিনি।

স্থানীয় পত্রিকাটির সম্পাদক এবং কালের কণ্ঠের মেহেরপুর জেলা প্রতিনিধি ইয়াদুল মোমিন বলেন, মাহবুব চান্দু ভাইকে মোবাইল ফোনে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকি দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আমরা আইনগতভাবে আগাচ্ছি। মেহেরপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের ছোট ভাই রিপন মেসেঞ্জারে আমাকেও খুদে বার্তা দিয়ে প্রকাশিত সংবাদ সংশোধন করতে চাপ দিয়েছে। তবে পরে এই ঘটনার জন্য জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসান মাহবুব চান্দু ভাইকে ফোন দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বলে জানান তিনি।

এদিকে সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মেহেরপুরে কর্মরত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিরা তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

মেহেরপুর জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও যুগান্তরের জেলা প্রতিনিধি তোযাম্মেল আযম বলেন, এ বিষয়ে আমরা আইনি পদক্ষেপ নেব। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। হুমকির ঘটনায় ইতিমধ্যে মেহেরপুর সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

অভিযুক্ত রাকিবুল হাসান রিপনের বড় ভাই ও মেহেরপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসানের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

মেহেরপুর জেলা পুলিশ সুপার আলী হায়দার চৌধুরী জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে জিডি করা হলে তদন্ত সাপেক্ষে হুমকিদাতার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।